বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলারে পৌঁছালে বৈশ্বিক অর্থনীতি বড় ধরনের মন্দার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্বের বৃহৎ বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী। তাঁর মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি যদি দীর্ঘমেয়াদে অস্থির থাকে, তাহলে জ্বালানি বাজারে চাপ অব্যাহত থাকবে এবং এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতে গভীরভাবে পড়বে।
প্রধান নির্বাহী বলেন, ইরান যদি পশ্চিমা বিশ্বের জন্য ভূরাজনৈতিকভাবে হুমকি হিসেবেই থেকে যায় এবং তেলের উচ্চমূল্য দীর্ঘ সময় স্থায়ী হয়, তাহলে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং ভোক্তাদের ব্যয়ক্ষমতা কমে যাবে। এই দুইয়ের সম্মিলিত প্রভাবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে মন্থর হয়ে যেতে পারে।
একই সাক্ষাৎকারে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাত নিয়েও কথা বলেন। তাঁর মতে, এ খাতে এখনো কোনো বুদ্বুদ তৈরি হয়নি। তবে দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে শ্রমবাজারে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। তিনি মনে করেন, অনেকেই উচ্চশিক্ষার ডিগ্রির পেছনে ছুটছেন, অথচ কারিগরি ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতার দিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না, যা ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তন—এই দুটি বিষয়ই আগামী দিনে বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মত দেন তিনি।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে তেলের দামের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই প্রসঙ্গে তিনি দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। প্রথমত, যদি সংঘাতের সমাধান হয় এবং ইরান আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবার গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে, তাহলে তেলের দাম যুদ্ধপূর্ব সময়ের চেয়েও কমে যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, যদি তা না ঘটে, তাহলে দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম ১০০ ডলারের ওপরে, এমনকি ১৫০ ডলারের কাছাকাছি অবস্থান করতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুতর সংকট তৈরি করবে।
এই প্রেক্ষাপটে তিনি দেশগুলোর প্রতি বাস্তববাদী জ্বালানি ব্যবস্থাপনার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, সাশ্রয়ী জ্বালানি নিশ্চিত করা না গেলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।
এদিকে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্নের কারণে ইউরোজোন এবং যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসায়িক কার্যক্রমের গতি কমে এসেছে। একটি সূচক অনুযায়ী, ইউরোজোনের পারচেজিং ম্যানেজারস ইনডেক্স মার্চে কমে ৫০ দশমিক ৫–এ দাঁড়িয়েছে, যা আগের মাসে ছিল ৫১ দশমিক ৯। সূচকটি ৫০-এর ওপরে থাকলে প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে, আর নিচে নামলে সংকোচন বোঝায়।
একজন প্রধান অর্থনীতিবিদ জানান, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে এবং একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ইউরোজোনে স্থবিরতার ঝুঁকি বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। সেখানে কম্পোজিট পিএমআই সূচক মার্চে ১১ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ফেব্রুয়ারিতে যেখানে সূচক ছিল ৫১ দশমিক ৯, মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫১ দশমিক ৪।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এশিয়ার বাজারে তেলের দামে কিছুটা পতন দেখা গেছে। বুধবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৬ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৭ দশমিক ৫৬ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ডব্লিউটিআই ক্রুডের দামও ৫ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি কমে ৮৭ দশমিক ২০ ডলারে দাঁড়ায়।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধে আলোচনা চলছে এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো দ্রুত সমঝোতায় পৌঁছাতে আগ্রহী। তাঁর এই বক্তব্যের পর বাজারে তেলের দাম কিছুটা কমেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যদিও ইরানের কর্মকর্তারা এ ধরনের আলোচনার খবর অস্বীকার করেছেন এবং একে ভুয়া বলে উল্লেখ করেছেন।
একই সময়ে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
বিশ্বের বড় বড় জ্বালানি প্রতিষ্ঠানের প্রধানরাও সতর্কবার্তা দিয়েছেন। একটি শীর্ষ জ্বালানি কোম্পানির প্রধান জানান, খুব শিগগিরই ইউরোপে তেলের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
এর মধ্যেও এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান সূচক ২ শতাংশের বেশি বেড়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বাজারেও প্রায় একই হারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। হংকং ও সাংহাইয়ের সূচকেও সামান্য উত্থান লক্ষ্য করা গেছে।
সব মিলিয়ে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।





Add comment