কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনার শেষ নেই। প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রগতিকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল যে, এআই মানুষের কাজের চাপ কমাবে এবং কর্মঘণ্টা কমিয়ে ব্যক্তিগত জীবনের জন্য বাড়তি সময় এনে দেবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র কি সত্যিই এমন? যুক্তরাষ্ট্রের একটি শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বাস্তবতা বরং ভিন্ন দিকে ইঙ্গিত করছে। এআই কাজের চাপ কমানোর বদলে অনেক ক্ষেত্রেই তা আরও তীব্র করে তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত ‘এআই ডাজ নট রিডিউস ওয়ার্ক, ইট ইনটেনসিফাইজ ইট’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা গেছে, এআই ব্যবহারের ফলে কর্মীরা আগের চেয়ে দ্রুত কাজ শেষ করতে পারলেও কাজের মোট পরিমাণ কমছে না। বরং দ্রুততার সুযোগ নিয়ে তাঁরা আরও বেশি দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিচ্ছেন। এর ফলে দিন শেষে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি বাড়ছে।
এই গবেষণায় টানা আট মাস ধরে ২০০ জন কর্মীর কাজের ধরন বিশ্লেষণ করা হয়। শুরুতে কাউকে বাধ্যতামূলকভাবে এআই ব্যবহার করতে বলা হয়নি। তবে অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন এআই টুলের প্রিমিয়াম সংস্করণ ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে দেখা যায়, কর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজেদের কাজের গতি বাড়াতে শুরু করেছেন। এআইয়ের সহায়তায় দ্রুত কাজ সম্পন্ন হওয়ায় তাঁদের মধ্যে নতুন এক মানসিকতা গড়ে ওঠে। আগে যেসব কাজ সময়সাপেক্ষ বা জটিল মনে হতো, এখন সেগুলোও সম্ভব বলে মনে হতে থাকে।
ফলে অনেক কর্মী আগের মতো কাজ জমিয়ে রাখা বা সহকর্মীদের কাছে হস্তান্তর করার পরিবর্তে নিজেই সব দায়িত্ব নিতে শুরু করেন। উৎপাদনশীলতা বাড়লেও এর মূল্য দিতে হচ্ছে ক্লান্তি দিয়ে। গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, দ্রুত কাজ শেষ করার পর বিশ্রাম নেওয়ার পরিবর্তে অধিকাংশ কর্মী নতুন কাজ হাতে নিচ্ছেন। তাঁদের মনে হচ্ছে, যেহেতু এআই সহায়তা করছে, তাই আরও বেশি কাজ করা সম্ভব।
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, আগে যেসব কঠিন বা সময়সাপেক্ষ কাজ দলগতভাবে সম্পন্ন হতো, এখন তা অনেক ক্ষেত্রেই এককভাবে করা হচ্ছে। সহকর্মীর ওপর নির্ভরতা কমেছে, কিন্তু সেই সঙ্গে বেড়েছে ব্যক্তিগত চাপ। কাজের গতি বেড়ে যাওয়ার কারণে অনেকেই নিয়মিত বিরতি নেওয়া বা বিশ্রামের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করছেন। প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়লেও কর্মজীবনের ভারসাম্য অনেকের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এআই নিজে থেকে কাজের পরিমাণ নির্ধারণ করে না। এটি একটি যন্ত্রমাত্র। কাজের চাপ কমবে নাকি বাড়বে, তা নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের নীতি, প্রত্যাশা এবং কর্মসংস্কৃতির ওপর। প্রযুক্তি যখন একই সময়ে বেশি কাজ সম্পন্ন করার সুযোগ দেয়, তখন অনেক প্রতিষ্ঠানই কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত উৎপাদনশীলতা প্রত্যাশা করতে শুরু করে। এর ফলে কর্মীরা অজান্তেই প্রতিযোগিতার চাপে নিজেদের সীমা ছাড়িয়ে কাজ করতে থাকেন।
প্রযুক্তিখাতের কর্মীদের ক্ষেত্রে এই প্রবণতা আরও স্পষ্ট। এআইয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব নিচ্ছেন। বাহ্যিকভাবে এটি দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষণ মনে হলেও বাস্তবে তা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপ ও অবসাদ বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও বিষয়টি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। দেশের ফ্রিল্যান্সিং ও আইটি খাতে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য কাজ করছেন। বিদেশি ক্লায়েন্টদের প্রত্যাশা দ্রুত ডেলিভারি এবং অধিক উৎপাদনশীলতা। এআই ব্যবহারের সুযোগ আসার পর সেই প্রত্যাশা আরও বেড়েছে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে অনেকেই দিন-রাত কাজ করছেন। আয় বৃদ্ধি পেলেও শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর তার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেক কর্মী সামাজিক জীবন থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন।
গবেষণার তথ্য ইঙ্গিত করছে, প্রযুক্তির অগ্রগতি একমাত্র বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। যদি এআই ব্যবহারের ফলে ব্যক্তিগত সময় সংকুচিত হয়ে যায়, তবে সেই অগ্রগতির সুফল প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমন নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কর্মীরা শোষণের শিকার না হন। নির্দিষ্ট সময় পর কাজ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকার সংস্কৃতি গড়ে তোলাও জরুরি।
শেষ পর্যন্ত এআই মানুষের সহায়ক হিসেবেই থাকা উচিত। এটি কাজকে সহজ করার জন্য, জীবনকে জটিল করে তোলার জন্য নয়। প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাতেই থাকা প্রয়োজন, যাতে কর্মজীবন ও ব্যক্তিজীবনের মধ্যে একটি সুস্থ ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হয়।





Add comment