জাপানে ভালুকের নাম শুনলেই একসময় মানুষের মনে ভেসে উঠত শিশুদের প্রিয় টেডি বিয়ার কিংবা জনপ্রিয় কার্টুন চরিত্র ‘উইনি দ্য পুহ’-এর কোমল চেহারা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই পরিচিত অনুভূতির জায়গা দখল করেছে ভয় আর আতঙ্ক। বিশেষ করে দেশটির উত্তরাঞ্চলে ভালুকের আক্রমণ এখন বড় ধরনের উদ্বেগে পরিণত হয়েছে। একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়ছে শঙ্কা।
চলতি বছরেও ইতোমধ্যে ভালুকের আক্রমণে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। গত ২১ এপ্রিল উত্তরাঞ্চলের ইওয়াতে জেলার শিওয়া এলাকা থেকে ৫৫ বছর বয়সী এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। দেশটির পরিবেশ মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, চলতি বছরে ভালুকের আক্রমণে নিহত হওয়া এটিই প্রথম ঘটনা।
এর কিছুদিন পর একই জেলার পাহাড়ি এলাকায় আরও এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় পুলিশ জানিয়েছে, ৬৯ বছর বয়সী ওই নারী পাহাড়ি জঙ্গলে বুনো ভোজ্য উদ্ভিদ সংগ্রহ করতে গিয়ে নিখোঁজ হন। পরদিন উদ্ধারকারীরা তাঁর মরদেহ খুঁজে পান। শরীরের বিভিন্ন স্থানে, বিশেষ করে মুখ ও মাথায় নখের আঘাতের চিহ্ন ছিল।
এদিকে ইয়ামাগাতা এলাকার একটি জঙ্গল থেকেও ৭৮ বছর বয়সী এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁর শরীরেও আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থলের কাছ থেকে একটি ভালুক বেরিয়ে এলে একজন শিকারি সেটিকে গুলি করে হত্যা করেন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, গত বছরের তুলনায় এ বছর অনেক আগেই প্রাণঘাতী আক্রমণের ঘটনা ঘটছে। গত বছর জুনের শেষ দিকে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেও এবার এপ্রিলেই একাধিক প্রাণহানি ঘটেছে। এতে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে।
জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে দেশজুড়ে ভালুকের আক্রমণে আহত হয়েছেন ২৩৮ জন এবং নিহত হয়েছেন ১৩ জন। এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে ইওয়াতে ও আকিতা জেলায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এবার এত দ্রুত আক্রমণ বাড়ার অন্যতম কারণ ভালুকের শীতনিদ্রার সময় পরিবর্তন হয়ে যাওয়া। সাধারণত জাপানের ভালুকেরা শীতকালে গুহা বা গাছের আশ্রয়ে দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে থাকে। শরতের সময় প্রচুর খাবার খেয়ে শরীরে চর্বি জমিয়ে তারা এই সময় পার করে। তবে শীত কম পড়লে বা পর্যাপ্ত খাবার না পেলে অনেক ভালুক আগেভাগেই জেগে ওঠে কিংবা শীতনিদ্রায় না গিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শীতকাল আগের তুলনায় উষ্ণ হয়ে উঠছে। এতে ভালুকের আচরণেও পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে কিছু ভালুক শীতের মধ্যেও খাবারের সন্ধানে বের হয়ে পড়ছে। ক্ষুধার্ত অবস্থায় এরা মানুষের ওপর আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।
আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো তথাকথিত ‘শহুরে ভালুক’। এসব ভালুক মানুষের সংস্পর্শে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। পাহাড় থেকে নেমে এসে লোকালয়ে খাবার খোঁজা এখন তাদের জন্য স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। অনেক সময় বাড়ির আশপাশের আবর্জনা ঘেঁটে খাবার সংগ্রহ করতেও দেখা যায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যেসব ভালুক একবার মানববসতিতে ঢুকে সহজে খাবার পেয়েছে, তারা বুঝে গেছে যে মানুষের এলাকায় এলেই খাবারের ব্যবস্থা পাওয়া যায়। ফলে তারা আর মানুষকে ভয় পাচ্ছে না। বরং নির্বিঘ্নে বসতিপূর্ণ এলাকায় চলে আসছে।
চলতি বছরের এপ্রিলেই উত্তর-পূর্ব জাপানের বিভিন্ন শহরে ভালুক দেখা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সেন্দাই শহরের একটি আবাসিক এলাকায় একটি ভালুককে দীর্ঘ সময় ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। পরে চেতনানাশক বন্দুক ব্যবহার করে সেটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনাস্থলটি ছিল শহরের প্রধান রেলস্টেশনের খুব কাছাকাছি।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ অর্থবছরে জাপানে যতগুলো ভালুকের আক্রমণের ঘটনা ঘটেছে, তার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই ঘটেছে তোহোকু অঞ্চলে। এবার সেই এলাকাগুলোতে আরও আগে থেকেই সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, বাদামের ফলন কমে যাওয়া ভালুকের খাদ্যসংকট বাড়িয়েছে। ফলে খাবারের খোঁজে তারা শহর কিংবা পর্যটন এলাকায় চলে আসছে। পাশাপাশি জাপানের গ্রামাঞ্চলে বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক জায়গার ঝোপঝাড় ও আগাছা পরিষ্কার রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এসব স্থানও ভালুকের নিরাপদ বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে দেশটিতে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে কঠোর নিয়ম থাকায় শিকারির সংখ্যা কমেছে। এটিও ভালুকের সংখ্যা ও আক্রমণ বৃদ্ধির একটি কারণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাপান সরকার ইতোমধ্যে কিছু পদক্ষেপ নিতে শুরু করেছে। ভালুকপ্রবণ এলাকায় গুলি চালানোর নিয়ম কিছুটা শিথিল করার পাশাপাশি টহল জোরদারের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও ড্রোন ব্যবহার, বৈদ্যুতিক বেড়া স্থাপন এবং উচ্চ শব্দে গান বাজানোর মতো পদ্ধতিও ব্যবহার করা হচ্ছে।
ভালুক আতঙ্কে সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পর্যটন ব্যবসায়ীরা। উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় দর্শনার্থীর সংখ্যা কমতে শুরু করেছে। তাই আয়োজকেরা বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা জোরদার করছেন। ফুকুশিমার একটি ম্যারাথন আয়োজনের সময় ভালুক দূরে রাখতে আতশবাজি ব্যবহার করা হয়েছিল। আবার চেরি ফুল উৎসব ঘিরে কিছু এলাকায় নজরদারির জন্য বিশেষ ড্রোন উড়ানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, খাদ্যসংকট ও মানুষের বসতির বিস্তার মিলিয়ে জাপানে মানুষ ও ভালুকের সংঘাত এখন নতুন মাত্রা পাচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারলে আগামী দিনগুলোতে এই আতঙ্ক আরও বাড়তে পারে।





Add comment