এভারেস্টের হিমবাহ গলার নেপথ্যে চমকপ্রদ কারণ

হিমালয় অঞ্চলে সম্প্রতি একটি হিমবাহের অংশ ধসে নেপালে সৃষ্ট প্রলয়ংকরী পাহাড়ি ঢল ও কাদাপানির আকস্মিক বন্যা পৃথিবীর জন্য প্রাণঘাতী প্রাকৃতিক দুর্যোগের অপেক্ষাকৃত নতুন একটি দিক সামনে এনেছে। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন জলবায়ু ও পরিবেশবিজ্ঞানীরা।

গত ২৬ আগস্ট নেপাল ও চীনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল তিব্বতের সীমান্তবর্তী এলাকায় ওই পাহাড়ি ঢল ও কাদাপানির বন্যায় এক হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং এখনো পাঁচ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

জলবায়ু ও পরিবেশবিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, পৃথিবীর তাপমাত্রা যে গতিতে বাড়ছে, তার প্রভাবে বিশ্বজুড়ে হিমবাহ গলতে শুরু করেছে, এবং এই তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে বিজ্ঞানীরা একাধিক কারণকে দায়ী করে থাকেন। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত একটি নতুন গবেষণায় হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলার এমন কিছু কারণ উঠে এসেছে, যা অনেকটাই বিস্ময়কর।

নতুন এই গবেষণা অনুযায়ী, এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে জ্বালানি পোড়ানোর ফলে সৃষ্ট তাপ এবং হিমবাহের ওপর সরাসরি ফেলা মানুষের মূত্রের কারণে প্রতিবছর প্রায় ২ হাজার ৫০০ টন বরফ ও তুষার গলে যেতে পারে। এভারেস্টের নেপাল অংশে অবস্থিত খুম্বু হিমবাহ নিয়ে গবেষণাটি চালিয়েছে একটি আন্তর্জাতিক গবেষক দল। গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে ‘রিজিওনাল এনভায়রনমেন্টাল চেঞ্জ’ নামের একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে।

বসন্তকালীন পর্বতারোহণ মৌসুমে হাজার হাজার পর্বতারোহী, গাইড ও সহায়ক কর্মী এভারেস্ট বেজ ক্যাম্পে জড়ো হন, আর তখন এই ক্যাম্পটি রীতিমতো একটি জমজমাট পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়। সেখানে থাকে এসপ্রেসো কফির ক্যাফে, বড় পর্দার টেলিভিশন, উচ্চগতির ইন্টারনেট সংযোগ, গরম পানির ঝরনা, এমনকি তাঁবুর মেঝে গরম রাখার ব্যবস্থাও।

গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালের বসন্ত মৌসুমে টানা ৫০ দিন ধরে নেপাল অংশের বেজ ক্যাম্পে থাকা প্রায় ১ হাজার ৬০০টি তাঁবুতে রান্না, তাঁবু গরম রাখা ও বিদ্যুৎ সরবরাহের কাজে মোট ৮২৪টি এলপিজি সিলিন্ডার, ১৮ হাজার ৯৩৫ লিটার কেরোসিন এবং ৫ হাজার ১৩০ লিটার পেট্রল ব্যবহৃত হয়েছে। এর সঙ্গে মানুষের মূত্র থেকে উৎপন্ন তাপ যোগ করলে মোট শক্তি উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৮ লাখ ৪৯ হাজার ১৭৪ মেগাজুল, যা আনুমানিক ২ হাজার ৪৯২ টন বরফ ও তুষার গলিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। তবে হিসাবের সম্ভাব্য ত্রুটি বিবেচনায় নিলে এই পরিমাণ ১ হাজার ৯৬৪ থেকে ৩ হাজার ২০ টনের মধ্যে হতে পারে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে গবেষণায়।

অতিরিক্ত উচ্চতায় শরীরে পানিশূন্যতা এড়াতে পর্বতারোহী ও গাইডরা প্রচুর পরিমাণে পানি পান করে থাকেন, যার ফলে প্রতিদিন সব মিলিয়ে প্রায় ছয় হাজার লিটার মূত্র উৎপন্ন হয় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এই বিপুল পরিমাণ মূত্র নিজেই একটি উল্লেখযোগ্য তাপের উৎস হিসেবে কাজ করে বলে জানিয়েছেন গবেষকেরা। তুলনামূলকভাবে বোঝাতে গিয়ে তাঁরা উল্লেখ করেন, এই পরিমাণ পানি দিয়ে একটি অলিম্পিক মাপের সুইমিংপুল ভরে ফেলা সম্ভব, অথবা এতে প্রায় ৮৩টি ট্যাংকার ট্রাক কিংবা প্রায় ১৬ হাজার ৭০০টি সাধারণ বাথটাব ভরানো যাবে।

কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ করে নিচে নামিয়ে আনা হলেও বিপুল পরিমাণ মূত্র সরাসরি হিমবাহের ওপরই ফেলে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, শুধু এই মূত্র থেকে উৎপন্ন তাপেই এক মৌসুমে প্রায় ১৫৪ টন বরফ গলে যেতে পারে।

স্যাটেলাইট থেকে সংগৃহীত তথ্যেও বেজ ক্যাম্পের আশপাশের এলাকায় তাপমাত্রা বৃদ্ধির আরও বিস্তৃত একটি প্রবণতার আভাস পাওয়া গেছে। ১৯৯১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ল্যান্ডস্যাট উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখতে পেয়েছেন, বেজ ক্যাম্প এলাকার তাপমাত্রা বছরে গড়ে শূন্য দশমিক ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে বেড়েছে, যা খুম্বু হিমবাহের আশপাশের অন্যান্য এলাকায় রেকর্ড করা তাপমাত্রা বৃদ্ধির হারের প্রায় দ্বিগুণ।

নেপালের ভূমি ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ জরিপবিদসহ গবেষক দলের সদস্যরা জানিয়েছেন, মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রকৃত প্রভাব সম্ভবত এই হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে। কারণ তাঁদের হিসাবে হেলিকপ্টার চলাচল থেকে সৃষ্ট তাপ, পর্বতারোহীদের শরীরের তাপ কিংবা সরঞ্জাম বহনে ব্যবহৃত ইয়াকের শরীর থেকে উৎপন্ন তাপ অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

গবেষকেরা তাঁদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলেছেন, এভারেস্টের হিমবাহ গলে যাওয়ার প্রধান কারণ মূলত জলবায়ু পরিবর্তনই। তবে তাঁরা একই সঙ্গে এ বিষয়েও গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, ইতিমধ্যে দ্রুতগতিতে গলতে থাকা একটি হিমবাহের ওপর বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার মানুষকে এভাবে জড়ো করে রাখার প্রবণতাও দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed