কল্পনা করুন হাতে একটি পুরোনো ছবি। ছবির মানুষটির মাথায় লম্বা চুল, পরনে কাঁধজোড়া ওভারসাইজড ব্লেজার, কানে বড় দুল। ছবির রং কিছুটা ফিকে, কোথাও কোথাও দানাদার ভাব। দেখে মনে হবে ছবিটি বুঝি ১৯৮০-র দশকে তোলা। অথচ বাস্তবে ছবির মানুষটি ২০২৬ সালের।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘আমি যদি আশির দশকের হতাম, তাহলে কেমন দেখাত’ নামের একটি ট্রেন্ডে গা ভাসাচ্ছেন অসংখ্য নেটিজেন। নিজের বর্তমান ছবি এআইয়ের সাহায্যে বদলে ফেলছেন আশির দশকের আদলে, পোশাক, চুল, মেকআপ, গাড়ি, ঘরের সাজ, এমনকি পুরোনো ছবির সেই দানাদার ভাবটুকু পর্যন্ত। সেপ্টেম্বরের শুরুতে জন্ম নেওয়া এই ট্রেন্ড মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ইনস্টাগ্রাম থেকে ছড়িয়ে পড়েছে ফেসবুকেও। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি অনেক তারকাও এতে যুক্ত হয়েছেন।
সংযমের বদলে বাড়াবাড়িই ছিল আশির দশকের ফ্যাশনের মূল সুর। আজকের হাই ফ্যাশনের বহুল প্রচলিত বাক্য ‘লেস ইজ মোর’ তখনো জন্মায়নি। চওড়া কাঁধ, বড় চুল, উজ্জ্বল রং, নাটকীয় সিলুয়েট, পোশাক যেন নিজেই বলত তার উপস্থিতির কথা। বাংলাদেশেও আশির দশক ছিল ফ্যাশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার। এই সময় নারীরা পোশাক নিয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিরীক্ষা শুরু করেন। জনপ্রিয় হয়ে ওঠে পোলকা ডট, হল্টার-নেক ব্লাউজ, বড় হুপ কানের দুল, যার পেছনে বড় প্রভাব রেখেছিল হিন্দি সিনেমার নায়িকাদের স্টাইল।
বাংলাদেশের শাড়ির বুনন ও নকশাতেও এ সময় পরিবর্তন আসতে থাকে। জনপ্রিয় হতে থাকে ডিজাইনার শাড়ি, নকশিকাঁথার এমব্রয়ডারি ও টাই-ডাই। কামিজ, ব্লাউজ বা টপ, যা-ই হোক না কেন, কাঁধ থেকে হাতায় কুঁচি থাকাটা তখন অপরিহার্য বিষয় হয়ে ওঠে। পুরুষদের পোশাকেও এ সময় পশ্চিমা প্রভাব বাড়তে থাকে। ঢাকা হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে শার্ট, ট্রাউজার ও ডেনিমের ব্যবহার। তবে পাঞ্জাবি, ফতুয়া, স্যান্ডো গেঞ্জি ও লুঙ্গিও নিজেদের জায়গা ধরে রাখে। দশকের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে আসে ক্যাটস আই চশমা। নিউমার্কেট, সায়েন্স ল্যাবরেটরি ও এলিফ্যান্ট রোড এলাকা পরিণত হয় ফ্যাশনের কেন্দ্রে। এভাবেই আশির দশকে বাংলাদেশে ফ্যাশন কেবল পোশাক নয়, একটি ব্যবসা হিসেবেও দাঁড়াতে শুরু করে।
সে সময় ফ্যাশনের মূল অনুপ্রেরণা ছিল সিনেমা, টেলিভিশন ও পপ তারকারা। ১৯৮১ সালে এমটিভি চালুর পর গান ও পোশাক হয়ে ওঠে সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। আজকের তুলনায় সে সময় ফ্যাশনের বিস্তার ছিল অনেকটাই ধীরগতির, সিনেমা, টেলিভিশন, ম্যাগাজিন ও বিদেশফেরত মানুষের হাত ধরে তা পৌঁছাত ঢাকার মার্কেটে। অমিতাভ বচ্চন, শ্রীদেবী কিংবা দেশীয় পপশিল্পী আজম খানের স্টাইল অনুসরণ করেই তরুণেরা তখন দরজির কাছে যেতেন। বর্তমান সময়ের ইনফ্লুয়েন্সারদের জায়গায় তখন ছিলেন নায়ক-নায়িকা ও গায়ক-গায়িকারা। বিদেশি টিভি সিরিজ ও শিল্পীদের পাশাপাশি রুনা লায়লা, কবরী, ববিতা বা জাফর ইকবালের মতো দেশীয় তারকারাও সেই সময়ের ফ্যাশনকে ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তরুণীদের মধ্যে ববিতার ফোলা চুলের স্টাইল ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়।
মিঠুন চক্রবর্তীর একটি জনপ্রিয় সিনেমার প্রভাবে জনপ্রিয় হয় ঝলমলে পোশাক, টাইট প্যান্ট, বেল্ট, জ্যাকেট ও ডিস্কো ঘরানার লুক। শ্রীদেবী ও রেখার সিনেমার গান অনুপ্রেরণা জোগাত শাড়ির সঙ্গে স্টাইলিশ ব্লাউজ, বড় কানের দুল, চুড়ি ও আকর্ষণীয় হেয়ারস্টাইলের। পারভিন ববির পশ্চিমা ধাঁচের পোশাক, জাম্পস্যুট, বেল্ট, বড় সানগ্লাস ও টাইট ট্রাউজার শহুরে তরুণীদের ফ্যাশনে বড় প্রভাব ফেলেছিল। সিনেমার গান ও নাচের দৃশ্যে মেটালিক, ঝলমলে ও উজ্জ্বল রঙের পোশাকের ব্যবহার সে সময়ের পার্টি ও উৎসবের পোশাকেও প্রভাব ফেলে।
এই সময়েই ঢাকাই চলচ্চিত্রে নতুন ধারার ফ্যাশন দিয়ে তরুণদের কাছে আইকনে পরিণত হন জাফর ইকবাল। দশকের শেষ ভাগে মুক্তি পাওয়া একটি জনপ্রিয় সিনেমার পর অঞ্জু ঘোষের সাজগোজ, বিশেষ করে রুপার গয়না, কপালে বড় টিপ ও গ্রামীণ ঘরানার পোশাক দেশজুড়ে আলোড়ন তোলে।
রেট্রো ফ্যাশন সময়ে সময়ে ফিরে আসে, তবে প্রতিবারই একেবারে ভিন্ন রূপে। আজকের ফ্যাশনে সবচেয়ে বেশি ফিরে এসেছে ওভারসাইজড ব্লেজার, শোল্ডার প্যাড, হাইওয়েস্টেড জিনস, লেদার জ্যাকেট ও বোল্ড অ্যাকসেসরিজ। তবে এবারের এই ফিরে আসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একেবারে নতুন এক উপাদান, জেন-জির অতীতপ্রীতি। এই তরুণেরা আশির দশকে জন্ম নেননি, তবু সেই সময়ের নন্দনতত্ত্বের প্রতি তাঁদের গভীর আকর্ষণ রয়েছে। এই প্রবণতাকে বলা হয় অ্যানিমোইয়া, অর্থাৎ এমন এক সময়ের প্রতি টান, যে সময়ে নিজে কখনো বসবাস করেননি।
ডিজিটাল ও এআইনির্ভর এই সময়ে জেন-জির একটি অংশ ফিরে যাচ্ছেন রেট্রো নন্দনতত্ত্ব ও অ্যানালগ মাধ্যমের দিকে। এক ধরনের সারল্য ও অপূর্ণতার আকাঙ্ক্ষা থেকেই তাঁরা পেছনে ফেলে আসা ফ্যাশন ও সংস্কৃতিকে সাদরে গ্রহণ করছেন। আশির দশকের ছবি নিখুঁত ছিল না, তাতে ছিল দানাদার ভাব, ছিল না কোনো ফটোশপের ছোঁয়া। আর এই অসম্পূর্ণতাই আজকের অতিরিক্ত মসৃণ ডিজিটাল দুনিয়ায় নতুন এক আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
আগে আশির দশক পুনর্নির্মাণ করতে প্রয়োজন হতো ভিনটেজ পোশাক, হেয়ার স্টাইলিস্ট ও পুরোনো ধাঁচের ক্যামেরা। এখন প্রয়োজন কেবল একটি ছবি আর একটি প্রম্পট। মুখ অক্ষত রেখেই এআই বদলে দিতে পারে চুল, ব্লেজার, মেকআপ, গাড়ি এমনকি ছবির রংও, সঙ্গে যোগ করতে পারে সেই চেনা দানাদার ভাবও। এটি একধরনের আইডেন্টিটি প্লেও বটে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি ও সবকিছুর অতিরিক্ত সহজলভ্যতার মধ্যে এই প্রজন্ম যেন কিছুটা থেমে সময়ের উল্টো স্রোতে ফিরতে চাইছে আশির দশকে, নিজেকেই যেন প্রশ্ন করছে অতীতে জন্মালে নিজেকে কেমন দেখাত তা একবার দেখে নেওয়ার জন্য।





Add comment