দেড় ডিগ্রি উষ্ণতা বাড়লে যে সর্বনাশ পৃথিবীর

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সংকট এসে পৌঁছেছে এক নতুন ও উদ্বেগজনক পর্যায়ে। খুব শিগগিরই পৃথিবী পেরিয়ে যেতে পারে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতা বৃদ্ধির সীমা। এই সীমা একবার অতিক্রান্ত হলে প্রকৃতির অনেক ক্ষতি চিরতরে অপূরণীয় হয়ে যাবে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির একটি নতুন প্রতিবেদনে এমন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।

‘লিমিটিং ওভারশুট’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যেই বৈশ্বিক উষ্ণতা দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা পার হয়ে যেতে পারে। উষ্ণতা এই সীমা ছাড়ালে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন আঘাত হানবে এবং ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো সমুদ্রের নিচে তলিয়ে যাওয়ার প্রকৃত ঝুঁকিতে পড়বে। এ কারণে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি, উভয় পর্যায়েই গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে প্রতিবেদনে।

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির ভারত শাখার একজন প্রধান কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দক্ষিণ এশিয়াকে একই সঙ্গে একাধিক জটিল সমস্যা মোকাবিলা করতে হচ্ছে। জনসংখ্যার চাপ ও আয়বৈষম্যের কারণে এই অঞ্চল বাড়তি ঝুঁকিতে আছে, পাশাপাশি প্রযুক্তি প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও রয়ে গেছে বড় ধরনের বৈষম্য। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঐতিহাসিকভাবে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূমিকা তুলনামূলক কম হলেও এর মাশুল এই অঞ্চলের দেশগুলোকেই সবচেয়ে বেশি গুনতে হচ্ছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে আবদ্ধ থাকে না বলেই বহুপক্ষীয় আলোচনা ও সমন্বিত কাঠামোর গুরুত্ব অনেক বেশি। জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক কাঠামোর আওতায় এই সংকট সমাধানের চেষ্টা এখনো চলমান।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু-সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি সংকট দ্রুত ঘনিয়ে আসছে। তাপমাত্রা কোনোভাবে কমিয়ে আনা গেলে তার প্রভাব সরাসরি দেখা গেলেও হিমবাহের ক্ষেত্রে চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। কারণ তাপমাত্রা কমে গেলেও একবার গলে যাওয়া হিমবাহ সহজে আগের অবস্থায় ফিরে আসে না। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়াও একইভাবে দ্রুতগতিতে এগোয়, ফলে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনা গেলেও সমুদ্রপৃষ্ঠের পরিবর্তন তাৎক্ষণিকভাবে থামানো সম্ভব নয়।

জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিকে সবচেয়ে স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় ক্ষতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো প্রজাতি একবার চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে গেলে তা আর প্রাকৃতিক উপায়ে ফিরিয়ে আনার সুযোগ থাকে না। বিভিন্ন দেশের কৃষকদের জীবনযাত্রায় ইতিমধ্যে এর বড় প্রভাব পড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ঘন ঘন খরা ও বন্যার কারণে বহু পরিবার বাধ্য হয়ে তাদের চিরায়ত জীবিকা বদলাতে বাধ্য হচ্ছে, আর দশকের পর দশক চেষ্টা করেও এই ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

প্রতিবেদনে ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা ও ন্যায্যতার প্রশ্নটিও বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। এতে বলা হয়েছে, অতীতে যেসব দেশ তুলনামূলকভাবে বেশি পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করেছে, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় তাদের দায়িত্বও হওয়া উচিত তুলনামূলক বেশি। প্রতিবেদনের ভাষায়, জলবায়ু সংকট এখন কেবল একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, বরং তা মানুষের বেঁচে থাকা ও ভবিষ্যৎ উন্নয়নের এক অস্তিত্বগত প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্তমান নীতি ও পদক্ষেপের গতি অব্যাহত থাকলে দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসের সীমা অতিক্রম করা কার্যত অনিবার্য হয়ে উঠবে। তবে তাঁরা এটাও বলছেন, উষ্ণতা এই সীমা সাময়িকভাবে ছাড়িয়ে গেলেও পরবর্তী সময়ে তা যতটা সম্ভব দ্রুত নামিয়ে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া জরুরি, যাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মাত্রা কিছুটা হলেও সীমিত রাখা যায়। এ জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার দ্রুত কমিয়ে আনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানো এবং দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে জলবায়ু অভিযোজনে আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে প্রতিবেদনটি।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed