নেপালের সাম্প্রতিক ভূমিধস ও বন্যার বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর চমকে উঠেছেন অনেকেই। একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, তীব্র পানি ও স্রোতে আশপাশের বিভিন্ন স্থাপনা মুহূর্তের মধ্যে ভেসে গেলেও সবুজ রঙের একটি বহুতল ভবন অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। এই দৃশ্য দেখে অনেকে একে অলৌকিক ঘটনা বলে মন্তব্য করেছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে প্রকৌশলবিদ্যার জয় বা প্রকৃতির এক বিস্ময় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এই ভবনের টিকে থাকার পেছনে রয়েছে কিছু সুনির্দিষ্ট ও ব্যাখ্যাযোগ্য কারণ।
নেপালের নুওয়াকোট জেলার ত্রিশূলী শহরে আঘাত হানা এই আকস্মিক বন্যায় মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে নদীর পানির স্তর ৯ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়। জানা গেছে, হিমালয়ের একটি হিমবাহের ভাঙা অংশ নদীতে আছড়ে পড়ার কারণেই বরফ, শিলা ও কাদামাটির প্রলয়ংকরী স্রোত তৈরি হয়েছিল। উপত্যকার অধিকাংশ ঘরবাড়ি ও সেতু মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়লেও নদীর তীরে থাকা ওই সবুজ রঙের বহুতল ভবনটি টিকে থাকে।
ভবনটির টিকে থাকার রহস্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইউনিভার্সিটি অব দ্য সানশাইন কোস্টের প্রকৌশল বিভাগের একজন প্রধান জানান, কংক্রিট ও রিইনফোর্সড স্টিল বা রড দিয়ে তৈরি ভবনটির ভিত্তি শক্ত পাথরের ওপর স্থাপন করা হয়েছিল বলেই তীব্র স্রোতের আঘাত সহ্য করতে পেরেছে সেটি। এ ছাড়া পানিপ্রবাহের গতিপ্রকৃতিও ভবনটিকে রক্ষা করতে বড় ভূমিকা রাখে। ভবনের ঠিক উজানে ছোট একটি উঁচু ভূখণ্ড বা হেডল্যান্ড থাকায় সেই প্রাকৃতিক ঢাল নদীর প্রধান স্রোতকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেয়, ফলে বন্যার পানির মূল ধাক্কা সরাসরি ভবনের গায়ে আঘাত হানতে পারেনি।
প্রকৌশলগত দিক থেকে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভবনটির উঁচু ভিত্তি বা ফ্লোটিং মেকানিজম। অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহ্যবাহী কুইন্সল্যান্ডার ধাঁচের বাড়ির মতোই এই ভবনের নিচ দিয়ে পানি সহজেই প্রবাহিত হতে পেরেছে, ফলে মূল কাঠামোর ওপর চাপ অনেকটাই কম পড়েছে। এই বিশেষ কাঠামোগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই আশপাশের ভবনগুলো ধসে পড়লেও এটি অক্ষত থেকে যায়।
ভবনের মালিক জানান, নদীর কাছাকাছি অবস্থানের কথা মাথায় রেখে নির্মাণের সময় থেকেই বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছিল। নদীতীরের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে ভবনের ভিত্তি মজবুত করতে মূল কাঠামোর নিচে দুই থেকে তিন স্তরে বিশেষ উপাদান ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি ব্যবহার করা হয় উন্নত মানের সিমেন্ট ও রড, ফলে সাধারণ পাথর বা ইটের দেয়ালের তুলনায় ভবনটি অনেক বেশি মজবুত হয়ে ওঠে।
রিইনফোর্সড কংক্রিট ফ্রেম ও স্টিলের সমন্বয়ে তৈরি হওয়ায় ভবনের কলাম, বিম ও ভিত্তি একটি অবিচ্ছিন্ন কাঠামোগত কঙ্কালের মতো একসঙ্গে কাজ করেছে। এর ফলে নদীর স্রোত ও ভাসমান পাথরের তীব্র আঘাত কোনো একক জায়গায় কেন্দ্রীভূত না হয়ে পুরো কাঠামোয় সমানভাবে বণ্টিত হয়ে মাটির দিকে চলে গেছে।
কাঠামোগত দিক ছাড়াও নদীর প্রাকৃতিক গতিপ্রকৃতিও ভবনটিকে রক্ষা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ধ্বংসাত্মক স্রোতের মূল পথ থেকে ভবনটি কিছুটা উঁচুতে অবস্থিত ছিল বলে সবচেয়ে ভারী পাথর ও ধ্বংসাবশেষের সরাসরি আঘাত থেকে রক্ষা পায় এটি। এ ছাড়া ভবনের নির্মাণ-আকৃতি এমনভাবে করা হয়েছিল যে তা পানির প্রবাহকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেয়, ফলে পানির মূল ধাক্কা ভবনের সামনের দিকে সরাসরি না লেগে দুই পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনা দুর্যোগপ্রবণ নদীতীরবর্তী এলাকায় ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ কিছু শিক্ষা দেয়। শক্ত ভিত্তি, উঁচু কাঠামো এবং আশপাশের প্রাকৃতিক ভূপ্রকৃতি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পিতভাবে নির্মাণকাজ করা হলে আকস্মিক বন্যা বা ভূমিধসের মতো দুর্যোগেও প্রাণ ও সম্পদহানি অনেকাংশে কমানো সম্ভব।





Add comment