বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে প্রবাসে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চার নিয়মিত আয়োজন লেখকের অঙ্গন’র ২৫তম গ্রন্থালোচনা গত ৩০ মে কুইন্স পাবলিক লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত হয়েছে| অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব নীরা কাদরী|
অনুষ্ঠানের শুরুতেই আমেরিকার জনপ্রিয় শিশু সাহিত্যিক ক্যারোন হেসে’র নিউবেরী পদক বিজয়ী কাব্য উপন্যাস ‘আউট অফ দ্যা ডাস্ট‘ বইটি নিয়ে আলোচনা করেন দিমা নেফারতিতি| আমেরিকায় ১৯৩০ এর দশকে ওকলাহোমায় ভয়ংকর ধূলিঝড়, মহামন্দা, খরা পীড়িত এক কৃষক পরিবারের কিশোরী কন্যা বিলি জো এর কিশোর জীবনের উত্থান, পতন, মর্মন্তুদ দুর্ঘটনা, শোক কে শক্তিতে রূপান্তরিত করে, জীবনে ঘুরে দাঁড়াবার কাহিনী নিয়ে এই উপন্যাস| দীর্ঘ, মনোজ্ঞ আলোচনায় দিমা নেফারতিতি বলেন, উপন্যাসের আঙ্গিক, বিষয়বস্ত এবং করুন জীবন বাস্তবতার সত্যাšে^ষী বার্তা বইটির মূল আকর্ষণ| শোক-কে শক্তিতে পরিণত করে আশা, সহনশীলতা, ক্ষমা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ তথা মানবিকতার অমূল্য দীক্ষা’র কারণে বইটি সর্বস্তরের পাঠকের জন্যই একটি ক্লাসিক অনুপ্রেরণামূলক বই|
¯^পন বিশ্বাস আলোচনা করেন প্রখ্যাত জার্মান লেখক হেরমান হেস’র ‘সিদ্ধার্থ‘ বইটি নিয়ে যা অনুবাদ করেছেন জাফর আলম| ¯^পন বিশ্বাস আলোচনায় উল্লেখ করেন, গৌতম বুদ্ধের অপর নাম সিদ্ধার্থ| সাধারণভাবে পরিজ্ঞাত বুদ্ধ-কে অতিক্রম করে এই বইতে এক নতুন বুদ্ধ কে সৃষ্টির অনন্য প্রয়াস রেখেছেন লেখক হেরমান হেস| অজগ্র দার্শনিক সংলাপে সমৃদ্ধ বইটিতে মানবাত্মার নির্বাণ লাভের প্রক্রিয়ার উপরে আলোকপাত করা হয়েছে| মানবজীবনে আধ্যাতিকতার চর্চার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে এই বইতে| লেখক হেরমান হেস চিহ্নিত করেছেন, অধ্যাত্বিকতা মানে জীবন বিমুখতা নয়, পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং পৃথিবীর সবকিছুকে ভালোবেসে ˆবশ্বিক একতার সারথি হতে পারাই অধ্যাত্বিকতা|
অভিক সোবহান আলোচনা করেন রাহাত আবির এর ইংরেজি উপন্যাস ‘বেঙ্গল হাউন্ড’ নিয়ে| অভিক সোবহান তার দীর্ঘ, মনোজ্ঞ আলোচনায় উল্ল&যেখ করেন, বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত লেখক রাহাত আবির এর লেখা এই ইংরেজি বইটি একটি ঐতিহাসিক কল্পকাহিনীমূলক উপন্যাস, যা ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয়| এর প্রেক্ষাপট ১৯৬০-এর দশকের বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতাপূর্ণ ঢাকা শহর| এটি শেলি নামের এক হিন্দু ছাত্রী এবং রোক্সানা নামের এক মুসলিম মেয়ের করুণ প্রেমের গল্প, যারা ধর্মীয় ভিন্নতার কারণে পালিয়ে যায়|
উপন্যাসটিতে জাতীয়তাবাদ, প্রেম, বিচ্ছেদ এবং ব্যক্তিগত জীবনে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাবের মতো বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে, যেখানে জাদুবাস্তবতার উপাদানও রয়েছে| পূর্ব পাকিস্তানে গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে তাদের এই দুর্ভাগ্যজনক প্রেমের কাহিনী উন্মোচিত হয়, যার পরিসমাপ্তি ঘটে বাংলাদেশ সৃষ্টির মাধ্যমে| এটি শুরুতে একটি একরৈখিক উপন্যাস মনে হলেও, সমান্তরালভাবে বিশদ চিত্রকল্প এবং আবেগীয় বর্নণার দুর্লভ সমš^য়ও রয়েছে উপন্যাসের আঙ্গিকে| এর পড়তে পড়তে রয়েছে ম্যাজিক রিয়ালিজমের প্রকাশ|
স্টিফেন ক্রেনস্কির লেখা শিশুতোষ জীবনী ‘লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’ নিয়ে আলোচনা করেন আরিফ মাহমুদ ˆশবাল| দীর্ঘ, মনোজ্ঞ আলোচনায় আরিফ মাহমুদ ˆশবাল উল্ল&যেখ করেন, ২০২০ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত ১২৮ পৃষ্ঠার এই বইটি ৮-১২ বছর বয়সী (তৃতীয় থেকে সপ্তম শ্রেণি) শিশুদের জন্য ˆতরি করা হয়েছে এবং এতে এই ইতালীয় বহুবিদ্যাবিশারদ লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’র জীবনকে একজন শিল্পী ও দূরদর্শী উদ্ভাবক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে| বইটিতে তাঁর জীবনের প্রধান মাইলফলকগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যেমন: ফ্লোরেন্সের কাছে একটি পাহাড়ের চূড়ার গ্রামে তাঁর শান্ত ˆশশব| মোনা লিসার মতো তাঁর ˆশল্পিক শ্রেষ্ঠকর্ম| তাঁর ভবিষ্যৎমুখী নকশা এবং প্রকৌশলগত ধারণা (যেমন প্যারাসুট, হেলিকপ্টার এবং সাঁজোয়া ট্যাঙ্ক), যা ˆতরির প্রযুক্তি আসার বহু শতাব্দী আগেই তিনি সৃষ্টি করেছিলেন| লিওনার্দো দা ভিঞ্চি’র চিত্রকলার অনুপ্রেরণা ছিল বিজ্ঞান এবং ভিঞ্চি তার প্রতিটি শিল্পকর্মে, ˆশল্পিক প্রয়াসে ‘আর্ট ফর রিজন’ আদর্শকে উপজীব্য করেছেন|
এ.বি.এম. সালেহ উদ্দিন, গবেষক ওবায়দুল্লাহ মামুন সম্পাদিত ‘একুশের কথা, একুশের চেতনা’ বইটি নিয়ে আলোচনা করেন| দীর্ঘ, মনোজ্ঞ আলোচনায় এ.বি.এম. সালেহ উদ্দিন উল্লেখ করেন, ‘একুশের কথা, একুশের চেতনা’ ২১ জন সক্রিয় ভাষা ˆসনিকের স্মৃতিধর্মী ২১ টি প্রবন্ধের এক অনন্য সংকলন| অমর একুশ কেবল একটি তারিখ বা সংখ্যা নয় এটি আমাদের চেতনা এবং অস্তিত্বের প্রতীক| একুশের আদর্শে উজ্জীবিত হয়েই অর্জিত হয়েছে আমাদের মহান ¯^াধীনতা| ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সরদার ফজলুল করিম, তাজউদ্দীন আহমদ, আলাউদ্দিন আল আজাদ, এম. আর. আখতার মুকুল সহ ২১ জন বরেণ্য এবং সক্রিয় ভাষা ˆসকিনদের এই দুর্লভ প্রবন্ধগুলোয় আমরা জানতে পারি রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের অনেক অজানা, দুর্লভ তথ্য, প্রাবন্ধিকদের স্মৃতির গহ্বরে সঞ্চিত অরোও অনেক অজানা স্মৃতি|
অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন, ওবায়দুলল্লাহ মামুন, ˆসকত, বদরুন নাহার, ˆশবাল সহ কমিউনিটির বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ| অনুষ্ঠানটির পরিচালক নীরা কাদরী সমাপনী আলোচনায় বলেন, প্রযুক্তি ও দ্রুতগতির বিশ্বে, সাহিত্য একটি অপরিহার্য বিষয়| সাহিত্য চিন্তার উন্মেষ ঘটায়, আমাদেরকে আরো মানবিক করে তোলে| শিল্প-সাহিত্য সৃজনশীলতার অসীম সম্ভাবনাকে বিকশিত করে| শিল্প-সাহিত্য মানব অভিজ্ঞতার জন্য অপরিহার্য একটি সার্বজনীন ভাষা হিসেবে কাজ করে এবং সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও ইতিহাস লিপিবদ্ধ করার্য অনন্য ভূমিকা রাখে| তাই বই পড়া হোক আমাদের নিত্যকার প্রিয় অনুষঙ্গ|





Add comment