এআই মুনাফা ঘিরে স্যামসাংয়ে অস্থিরতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তির বিস্ফোরক উত্থানে সবচেয়ে বেশি লাভবান হওয়া বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম স্যামসাং ইলেকট্রনিকস। সেমিকন্ডাক্টর ও মেমোরি চিপের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় দক্ষিণ কোরিয়ার এই প্রযুক্তি জায়ান্ট চলতি বছর ট্রিলিয়ন ডলারের কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশটির শেয়ারবাজারেও। সিউলের পুঁজিবাজার এখন বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম বাজার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

তবে প্রতিষ্ঠানের এই রেকর্ড সাফল্যের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে কর্মীদের মধ্যে। বিশেষ করে বেতন ও বোনাস কাঠামো নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাজারো শ্রমিক। কয়েক হাজার কর্মী ধর্মঘটের হুমকি দেওয়ায় পরিস্থিতি একপর্যায়ে বড় সংকটে রূপ নিতে শুরু করে। যদি এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হতো, তাহলে এআই খাতে বহুল ব্যবহৃত মেমোরি চিপ উৎপাদনে বড় ধরনের ব্যাঘাত ঘটার আশঙ্কা ছিল।

অবশেষে সম্ভাব্য ধর্মঘট শুরুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে শ্রমিক ইউনিয়ন ও কোম্পানির ব্যবস্থাপনা প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছায়। যদিও এখনো ইউনিয়নের সদস্যদের ভোটে সেটি চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, তবু এটিকে কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই কোম্পানির বিপুল মুনাফার তুলনায় নিজেদের প্রাপ্তি কম বলে অভিযোগ করে আসছিলেন তাঁরা।

সম্ভাব্য এই ধর্মঘট হলে তা হতে পারত স্যামসাংয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কর্মবিরতি। প্রায় ১৮ দিনব্যাপী কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা ছিল ৪৮ হাজারের বেশি কর্মীর। যা দক্ষিণ কোরিয়ায় কোম্পানিটির মোট কর্মীর প্রায় ৪০ শতাংশ। ধর্মঘটে অংশ নিতে যাওয়া বেশির ভাগ কর্মীই মেমোরি চিপ বিভাগে কাজ করেন। এনভিডিয়া ও এএমডির মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের এআই হার্ডওয়্যারে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তৈরি হয় এই বিভাগেই।

বিশ্বব্যাপী যখন ডেটা সেন্টার নির্মাণের জোয়ার চলছে এবং এআই প্রযুক্তির বিস্তারে সেমিকন্ডাক্টরের চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে, তখন উৎপাদনে যেকোনো বিঘ্ন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নয়, পুরো প্রযুক্তি শিল্পের জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারত। দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের মধ্যেও এ নিয়ে দুশ্চিন্তা দেখা দেয়। কারণ, গত বছর স্যামসাংয়ের মোট আয় ছিল দেশটির মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশেরও বেশি। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের শীর্ষ তিন মেমোরি চিপ নির্মাতার একটি।

দেশটির প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হলে সেটি শুধু করপোরেট ক্ষতি নয়, জাতীয় অর্থনীতির ওপরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ প্রযুক্তিনির্ভর রপ্তানি অর্থনীতিতে স্যামসাংয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে এআই প্রযুক্তির উত্থান বিশ্বজুড়ে চাকরির ধরন ও শ্রমবাজারে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সম্প্রতি মেটা প্রায় ১৫ হাজার কর্মীকে পুনর্বিন্যাস ও ছাঁটাই করেছে। প্রতিষ্ঠানটির লক্ষ্য এখন এআই খাতে আরও বেশি বিনিয়োগ। একই পথে হাঁটছে অ্যামাজন, লিংকডইন ও স্ন্যাপের মতো প্রতিষ্ঠানও। ফলে প্রযুক্তি শিল্পে একদিকে যেমন বিপুল মুনাফা তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও শ্রম নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে স্যামসাংয়ের কর্মীরা দাবি তুলেছেন, কোম্পানির রেকর্ড মুনাফার বড় অংশ তাঁদের মধ্যেও বণ্টন করতে হবে। ইউনিয়নের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমানে বার্ষিক বেতনের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বোনাসের যে সীমা রয়েছে, সেটি বাতিল করতে হবে। পাশাপাশি পরিচালন মুনাফার অন্তত ১৫ শতাংশ কর্মীদের বোনাস হিসেবে বরাদ্দের দাবি জানানো হয়েছে। শুধু এ বছর নয়, ভবিষ্যতেও এই সুবিধা বহাল রাখার দাবি তুলেছেন তাঁরা।

স্যামসাংয়ের কর্মীদের ক্ষোভ আরও বেড়েছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান এসকে হাইনিক্সের বোনাস কাঠামো দেখে। দক্ষিণ কোরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম এই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান চলতি বছর নতুন বোনাস নীতি চালু করেছে। সেখানে মূল বেতনের এক হাজার শতাংশ পর্যন্ত সীমা তুলে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালন মুনাফার ১০ শতাংশ কর্মীদের বোনাস তহবিলে দিচ্ছে। এর ফলে কিছু কর্মী নিজেদের মূল বেতনের প্রায় ৩ হাজার শতাংশ পর্যন্ত বোনাস পাচ্ছেন।

এই বৈষম্যকে কেন্দ্র করে স্যামসাংয়ের শ্রমিক ইউনিয়ন বলেছে, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এখন দক্ষ জনবল ধরে রাখার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। বিদেশি প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রকৌশলীদের আকর্ষণীয় প্রস্তাব দিচ্ছে। ফলে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে স্যামসাংকেও কর্মীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।

সাম্প্রতিক সমঝোতার অংশ হিসেবে স্যামসাং বিদ্যমান বোনাস সীমা তুলে নিতে এবং সেমিকন্ডাক্টর বিভাগের জন্য ব্যবসায়িক মুনাফার ১০ দশমিক ৫ শতাংশ বোনাস হিসেবে বরাদ্দে সম্মত হয়েছে। কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, সে জন্য আরও গঠনমূলক শ্রম-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

এই বিরোধ দক্ষিণ কোরিয়াজুড়ে সম্পদ বণ্টন ও করপোরেট মুনাফা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। শ্রম অধিকারকর্মীদের মতে, এআই প্রযুক্তির উত্থানের ফলে সমাজে বৈষম্য আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একদিকে অনিরাপদ চাকরিতে থাকা সাধারণ কর্মীরা সংকটে পড়ছেন, অন্যদিকে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী কর্মীরা নজিরবিহীন বোনাস পাচ্ছেন।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed