যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের এভারেট শহরে ১৯৮৪ সালের এক পুরোনো ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মামলায় অবিশ্বাস্য এক মোড় এনে দিয়েছে সাধারণ একটি চুইংগাম। প্রায় ৫০ বছর আগের এই মামলায় দণ্ডিত এক আসামিকে শেষ পর্যন্ত শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে তার চিবানো চুইংগাম থেকে সংগ্রহ করা ডিএনএ প্রমাণের মাধ্যমে।
ঘটনার সূত্রপাত ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে। এক চুইংগাম কোম্পানির প্রচারণার অংশ হিসেবে সুসান লগোথেটি ও তাঁর দুই সহকর্মী একটি বাড়িতে যান। তাঁরা সন্দেহভাজন এক ব্যক্তিকে বিভিন্ন স্বাদের চুইংগাম চেখে দেখতে বলেন। পায়জামা পরা ওই ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবেই অতিথিদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিভিন্ন চুইংগাম স্বাদ গ্রহণ করেন।
এক পর্যায়ে তিনি চিবানো চুইংগাম একটি ছোট পাত্রে ফেলেন, যা বাইরে থেকে স্বাভাবিক একটি প্রচারণার অংশ মনে হলেও আসলে ছিল পুলিশের একটি গোপন অভিযান। সেই চুইংগাম থেকেই সংগৃহীত হয় গুরুত্বপূর্ণ ডিএনএ নমুনা।
প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালে সংঘটিত দুটি পৃথক ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ওই ব্যক্তির সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে ফরেনসিক প্রমাণ প্রয়োজন ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে অমীমাংসিত থাকা এই দুটি মামলায় প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নতুন করে তদন্ত শুরু করতে সহায়তা করে।
মামলার নথি অনুযায়ী, ১৯৮০ সালে ২১ বছর বয়সী এক নারীকে নিজ অ্যাপার্টমেন্টে হত্যা করা হয়। চার বছর পর ১৯৮৪ সালে আরেক নারীকে তার বাড়িতে প্রবেশ করে ধর্ষণ ও হত্যা করা হয়। প্রথমদিকে দুটি ঘটনাকে আলাদা বলে বিবেচনা করা হলেও পরবর্তীতে ফরেনসিক বিশ্লেষণে একই অপরাধীর সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
ফরেনসিক বিজ্ঞানীরা বছর কয়েক আগে সংরক্ষিত আলামত থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। তবে সন্দেহভাজনকে চূড়ান্তভাবে শনাক্ত করতে দ্বিতীয় একটি নমুনার প্রয়োজন ছিল। এরপরই পুলিশ নজরদারি শুরু করে এবং শেষ পর্যন্ত চুইংগাম কৌশল ব্যবহার করা হয়।
গোপনে সংগৃহীত চুইংগাম থেকে পাওয়া ডিএনএ আগের সংগৃহীত নমুনার সঙ্গে মিলে যায়। পাশাপাশি এটি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ আলামতের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ পাওয়া যায়, যা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করে।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ৬৮ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি দুই নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। বর্তমানে তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, আরও কয়েকটি পুরোনো মামলার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত রয়েছে। অতীতে তিনি একাধিক যৌন নির্যাতনের ঘটনায় দণ্ডিত হয়েছিলেন এবং প্রবেশনের শর্তেও নতুন অপরাধে জড়িয়েছিলেন।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলার সবচেয়ে বড় অগ্রগতি এসেছে ডিএনএ প্রযুক্তির উন্নতির কারণে। একসময় অসম্ভব মনে হওয়া অল্প পরিমাণ জৈবিক উপাদান থেকেও এখন নির্ভরযোগ্য প্রোফাইল তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে।
একজন ফরেনসিক বিজ্ঞানী জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা ছিল নমুনাটি হয়তো অচেনা কারও হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত মিল পাওয়া যাওয়ায় তদন্তে বড় অগ্রগতি আসে।
এই মামলার সঙ্গে যুক্ত তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পুরোনো অপরাধ সমাধানে আধুনিক ডিএনএ প্রযুক্তি এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কয়েক দশক আগের অমীমাংসিত মামলাগুলোও এখন ধীরে ধীরে সমাধানের পথে যাচ্ছে।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, এত বছর পর সত্য উদঘাটিত হওয়ায় তারা কিছুটা মানসিক স্বস্তি পেয়েছেন। তবে দীর্ঘ সময় ধরে বিচার না পাওয়ার ক্ষত এখনো রয়ে গেছে।
আদালতে অভিযুক্ত ব্যক্তি ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৫ সালের মধ্যে আরও কয়েকটি যৌন সহিংসতার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে অতীতেও একাধিক অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছিল।
শেষ পর্যন্ত সাধারণ একটি চুইংগামই হয়ে উঠেছে কয়েক দশকের পুরোনো একাধিক নৃশংস অপরাধের চাবিকাঠি, যা আধুনিক ফরেনসিক বিজ্ঞানের সক্ষমতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।





Add comment