ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের প্রভাব এবার সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় পড়তে শুরু করেছে। টানা কয়েক মাসের মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির ফলে তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো দেশটিতে মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির চেয়ে পিছিয়ে গেছে। ফলে নাগরিকদের প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় বাড়ছে আর্থিক চাপ ও উদ্বেগ।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ কনজ্যুমার প্রাইস ইনডেক্স অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে মাসভিত্তিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ০ দশমিক ৬ শতাংশ। এতে বার্ষিক মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশে, যা ২০২৩ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ। অর্থনীতিবিদেরা আগেই মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা করেছিলেন, তবে প্রকৃত হার প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকেই ইরান পরিস্থিতির প্রভাব অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করে। হামলার আগে মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছিল ২ দশমিক ৪ শতাংশে। কিন্তু মার্চ থেকে তা আবার ঊর্ধ্বমুখী হতে থাকে। বিশেষ করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এক বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক মন্তব্য করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় এখনও অস্বস্তিকর অবস্থায় রয়েছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য সুদহার কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।
কোভিড-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতির যে ঢেউ তৈরি হয়েছিল, তার চূড়ান্ত রূপ দেখা যায় ২০২২ সালের গ্রীষ্মে। সে সময় মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছিল ৯ দশমিক ১ শতাংশে, যা ছিল চার দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আবারও চাপ বাড়ছে।
এপ্রিল মাসে দেখা গেছে, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সমন্বয় করার পর গড় ঘণ্টাপ্রতি মজুরি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক হয়েছে। গত বছরের তুলনায় গড়ে বেতন বেড়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, কিন্তু একই সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এতে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমেছে।
এক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান অর্থনীতিবিদ জানিয়েছেন, ভোক্তারা আগে থেকেই চাপের মধ্যে ছিলেন। এর মধ্যে শ্রমবাজারেও দুর্বলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ফলে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা আরও বাড়ছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এখন পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে। শুধু তেলের দাম নয়, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় সার, অ্যালুমিনিয়াম ও হিলিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের সরবরাহেও চাপ তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পেট্রলপাম্প, মুদি দোকান ও বিদ্যুতের বিলে।
মার্চ মাসে গ্যাসের দাম বেড়েছিল রেকর্ড ২১ দশমিক ২ শতাংশ। এপ্রিলেও গ্যাসের দাম বেড়েছে আরও ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। একইভাবে বিদ্যুতের দামও বাড়তে থাকে। ডেটা সেন্টারের চাহিদা বৃদ্ধি, আবহাওয়া ও অবকাঠামোগত ব্যয়ের কারণে গত বছর থেকেই বিদ্যুতের বাজারে চাপ ছিল। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটে সেই পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়েছে। এপ্রিল মাসে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে ২ দশমিক ১ শতাংশ, যা চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি।
খাদ্যপণ্যের বাজারেও মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এপ্রিল মাসে খাদ্যের সামগ্রিক দাম বেড়েছে ০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মুদিপণ্যের দাম বেড়েছে ০ দশমিক ৭ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে খাদ্য ও মুদিপণ্যের দাম বেড়েছে যথাক্রমে ৩ দশমিক ২ ও ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিশেষ করে গরুর মাংস, ফল ও সবজির দাম উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ডিজেলচালিত রেফ্রিজারেটেড ট্রাকে পরিবহন করা তাজা ফল ও সবজির দাম এপ্রিল মাসে ২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে, যা ২০১০ সালের পর সর্বোচ্চ মাসিক বৃদ্ধি। টমেটোর দাম টানা দ্বিতীয় মাসের মতো ১৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
এক অর্থনীতিবিদের ভাষায়, যুদ্ধের প্রভাব এখন আমেরিকার ঘরে পৌঁছে গেছে এবং মানুষ তা বাজারের ব্যাগেই অনুভব করছে।
খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এপ্রিল মাসের মূল্যস্ফীতির প্রায় ৪০ শতাংশ এসেছে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি থেকে। তবে আবাসন খাতও বড় ভূমিকা রেখেছে। সরকারি কার্যক্রম বন্ধ থাকার কারণে গত বছরের কিছু পরিসংখ্যানগত সমন্বয়ের প্রভাব এবার হিসাবের মধ্যে এসেছে।
মূল্যস্ফীতির কোর সূচক, যেখানে খাদ্য ও জ্বালানির মতো অস্থির খাত বাদ দেওয়া হয়, সেটিও এপ্রিল মাসে ০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। বার্ষিক হিসাবে এর হার দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮ শতাংশে, যা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কিছু অংশ সাময়িক হলেও আগামী কয়েক মাস পরিস্থিতি অস্বস্তিকর থাকবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ব্যাংকও কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়েছে। কারণ মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকলে সুদহার কমানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এদিকে মূল্যস্ফীতিকে ঘিরে রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করছেন বর্তমান প্রশাসনের নীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনে এই অর্থনৈতিক চাপ বড় রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সম্পদবৈষম্যও বেড়েছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো ঋণের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। একই দিনে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিক্ষাঋণের খেলাপির হারও বেড়েছে, যা অর্থনীতির ভেতরের চাপকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।





Add comment