মহাবিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় কাঠামোগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ওয়ার্মহোল। দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীরা এই ধারণা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে আসছেন। ব্ল্যাকহোলের মতোই ওয়ার্মহোলও এমন এক অদ্ভুত কাঠামো, যেখানে মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এতটাই প্রবল যে তা স্থান ও কালের স্বাভাবিক বিন্যাসকে বদলে দিতে পারে। তবে ব্ল্যাকহোলের সঙ্গে এর বড় পার্থক্য হলো, ওয়ার্মহোল তাত্ত্বিকভাবে মহাবিশ্বের দুটি ভিন্ন স্থানের মধ্যে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে পারে। আর এবার বিজ্ঞানীদের এক নতুন গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, এমনই একটি বিশাল গোপন সুড়ঙ্গ আমাদের নিজস্ব গ্যালাক্সি মিল্কিওয়ের ভেতরেই লুকিয়ে থাকতে পারে।
এত দিন পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানীদের বড় একটি অংশ মনে করতেন, ওয়ার্মহোলের অস্তিত্ব তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাস্তবে এটি স্থায়ী হতে পারে না। কারণ, সৃষ্টি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেটি ধসে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তবে নতুন গবেষণায় একদল বিজ্ঞানী দাবি করছেন, মহাবিশ্বের রহস্যময় পদার্থ ডার্ক ম্যাটার এই ওয়ার্মহোল তৈরি করতে এবং দীর্ঘ সময় ধরে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, যদি এই ধারণা সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রেই হয়তো লুকিয়ে আছে মহাবিশ্বের অন্য কোনো অঞ্চলে যাওয়ার এক বিশাল প্রবেশদ্বার। এই তত্ত্ব ইতিমধ্যেই জ্যোতির্বিজ্ঞান ও মহাকাশ গবেষণার অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে।
ভারতের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রায় ওয়ার্মহোলকে একটি সুড়ঙ্গের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এটি এমন এক পথ, যা মহাবিশ্বের এক বিন্দুকে আরেক বিন্দুর সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, দুটি ম্যানহোল কভারের মধ্যকার সুড়ঙ্গ যেমন এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাওয়ার পথ তৈরি করে, ওয়ার্মহোলও তেমনভাবে কাজ করতে পারে। একটি অংশ হবে প্রবেশপথ, আর অন্য অংশ হবে বহির্গমন পথ।
তাত্ত্বিকভাবে কোনো বস্তু যদি এই সুড়ঙ্গে প্রবেশ করে, তাহলে তা মুহূর্তের মধ্যেই অন্য প্রান্ত দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, যদি এই কাঠামো যথেষ্ট প্রশস্ত এবং স্থিতিশীল হয়, তাহলে ভবিষ্যতে মানুষ কিংবা মহাকাশযানও এর ভেতর দিয়ে যাতায়াত করতে সক্ষম হতে পারে।
এই পুরো তত্ত্বের কেন্দ্রে রয়েছে ডার্ক ম্যাটার। এটি এমন এক অদৃশ্য পদার্থ, যা সরাসরি দেখা যায় না। কারণ, এটি আলো প্রতিফলিত করে না। তবে মহাকর্ষীয় প্রভাব বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে মহাবিশ্বের একটি বড় অংশ ডার্ক ম্যাটার দিয়ে গঠিত। ধারণা করা হয়, মহাবিশ্বের প্রায় ২৭ শতাংশই এই অদৃশ্য পদার্থের দখলে।
গবেষকদের মতে, ডার্ক ম্যাটারের অস্বাভাবিক ঘনত্ব এবং চরম পরিস্থিতিতে এর আচরণ স্থান-কালের গঠনকে বদলে দিতে পারে। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্রে ডার্ক ম্যাটারের যে বলয় রয়েছে, সেটিই সম্ভবত একটি বিশাল ওয়ার্মহোল তৈরি এবং স্থিতিশীল রাখার পেছনে ভূমিকা রাখছে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, মিল্কিওয়ের কেন্দ্রে অবস্থান করা এই সম্ভাব্য ওয়ার্মহোলের প্রস্থ প্রায় ৩২ হাজার ৬০০ আলোকবর্ষ হতে পারে। এটি এতটাই বিশাল যে এর অস্তিত্ব সত্য হলে মহাকাশ গবেষণার ধারণাই পাল্টে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের এক কসমোলজিস্ট মনে করেন, গবেষণার পেছনের যুক্তিগুলো যথেষ্ট শক্তিশালী। তাঁর মতে, প্রকৃতি প্রায়ই বৈজ্ঞানিকভাবে সম্ভব এমন কাঠামো তৈরি করে থাকে। তাই স্বাভাবিকভাবেই কোনো এক সময় মহাবিশ্বে ওয়ার্মহোলের সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব নয়। তিনি মনে করেন, ভবিষ্যতে মানুষ হয়তো এই ধরনের সুড়ঙ্গ ব্যবহারের প্রযুক্তিও তৈরি করতে পারবে।
তবে সব বিজ্ঞানী এই তত্ত্বে একমত নন। যুক্তরাজ্যের এক জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞানী এ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, ডার্ক ম্যাটার আদৌ ওয়ার্মহোলকে স্থিতিশীল রাখার মতো আচরণ করতে পারে, তার পক্ষে এখনো কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তিনি আরও বলেন, এত বিশাল একটি ওয়ার্মহোল খোলা রাখতে যে পরিমাণ নেগেটিভ এনার্জি প্রয়োজন, তা পুরো গ্যালাক্সির শক্তির চেয়েও বহু গুণ বেশি। অর্থাৎ এমন একটি সুড়ঙ্গ টিকিয়ে রাখতে হাজার হাজার গ্যালাক্সির সমপরিমাণ শক্তি দরকার হতে পারে।
তারপরও নতুন এই তত্ত্ব বিজ্ঞানীদের কল্পনায় নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। যদি গবেষণাটি ভবিষ্যতে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে হয়তো একদিন মানুষ শুধু নিজের গ্যালাক্সির মধ্যেই নয়, মহাবিশ্বের অন্য প্রান্তেও যাতায়াতের স্বপ্ন দেখতে পারবে।





Add comment