বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম ফের ঊর্ধ্বমুখী

বিশ্ববাজারে আবারও খাদ্যপণ্যের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু জ্বালানির দামই নয়, খাদ্যপণ্যের মূল্যও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতময় পরিস্থিতির পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এপ্রিল মাসে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা Food and Agriculture Organization প্রকাশিত খাদ্য মূল্যসূচক তিন বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এপ্রিল মাসে এফএওর ফুড প্রাইস ইনডেক্স দাঁড়িয়েছে ১৩০ দশমিক ৭ পয়েন্টে। মার্চ মাসের তুলনায় এই সূচক বেড়েছে ১ দশমিক ৬৩ শতাংশ। খাদ্যশস্য, চাল, ভোজ্য তেল, মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য এবং চিনি, এই ছয়টি প্রধান খাদ্যপণ্যের ভিত্তিতে এই সূচক নির্ধারণ করা হয়। এপ্রিল মাসে এসব পণ্যের অধিকাংশের দামই বৃদ্ধি পেয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক সূচকে।

টানা তৃতীয় মাসের মতো এই সূচকে বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে, যদিও আগের মাসের তুলনায় বৃদ্ধির গতি কিছুটা ধীর হয়েছে। বিশেষ করে উদ্ভিজ্জ তেল, মাংস এবং শস্যজাত পণ্যের দামে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটলেও চিনি ও দুগ্ধজাত পণ্যের দাম কিছুটা কমে যাওয়ায় সামগ্রিক চাপ আংশিকভাবে নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান বলছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এবারের এপ্রিল মাসে সূচক প্রায় ২ শতাংশ বেশি। তবে ২০২২ সালের মার্চ মাসে যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খাদ্যসূচক পৌঁছেছিল, তার তুলনায় বর্তমান সূচক এখনও প্রায় ১৮ দশমিক ৪ শতাংশ নিচে অবস্থান করছে।

এপ্রিল মাসে সবচেয়ে বেশি দামের উল্লম্ফন দেখা গেছে ভোজ্য তেল খাতে। মার্চের তুলনায় এই খাতে দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ। এর ফলে ২০২২ সালের জুলাইয়ের পর ভোজ্য তেলের দাম আবারও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। পাম, সয়াবিন, সূর্যমুখী এবং সরিষার তেলের দাম একসঙ্গে বৃদ্ধি পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ আরও বেড়েছে।

পাম তেলের দাম টানা পাঁচ মাস ধরে বাড়ছে। বিভিন্ন দেশে জৈব জ্বালানির চাহিদা বৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং অপরিশোধিত জ্বালানির উচ্চমূল্য এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও বাজারে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।

অন্যদিকে সয়াবিন এবং সরিষার তেলের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে মূলত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় অঞ্চলে জৈব জ্বালানির চাহিদা বাড়ার কারণে। সূর্যমুখী তেলের ক্ষেত্রে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে সরবরাহ সংকট অব্যাহত থাকায় দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। যদিও আর্জেন্টিনায় উৎপাদন বৃদ্ধির কারণে কিছুটা সরবরাহ বেড়েছে এবং সেখানে দাম তুলনামূলক স্থিতিশীল হয়েছে।

বিশ্ব খাদ্যবাজারে এই অস্থিরতার পেছনে আরও একটি বড় কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা। এর আগে রাশিয়া ও ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে খাদ্য ও জ্বালানির দামে বড় ধরনের উল্লম্ফন দেখা দিয়েছিল। ২০২২ সালে এফএওর খাদ্যসূচক ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, যার গড় মান ছিল ১৪৪-এর বেশি। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে তা কিছুটা কমে ১২৪-এ নেমে আসে। তবে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আবার তা ১৩০-এর ঘরে উঠে এসেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, খাদ্য ও জ্বালানি উভয় খাতেই একসঙ্গে দাম বৃদ্ধি আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়তে পারে, যেমনটা ২০২২ সালের বৈশ্বিক সংকটের সময় দেখা গিয়েছিল।

এদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এপ্রিল মাসে দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও বেড়ে ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে পৌঁছেছে। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে ৯ দশমিক ৫৭ শতাংশ হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর এই পরিস্থিতির প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য কেনায় ব্যয় হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যের দাম বাড়লে সরাসরি জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা নিম্ন ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য চাপ আরও বাড়িয়ে দেয়।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed