ফার্মগেট কেলেঙ্কারিতে চাপে রামাফোসা

দক্ষিণ আফ্রিকায় আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে বহুল আলোচিত ‘ফার্মগেট কেলেঙ্কারি’। এই ঘটনায় দেশটির প্রেসিডেন্ট রামাফোসার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এ নিয়ে তদন্ত চালাতে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার পার্লামেন্ট।

দেশটির পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ জানিয়েছে, স্পিকারের নেতৃত্বে খুব শিগগিরই তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির কাজ হবে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো যাচাই করা এবং অভিশংসন কার্যক্রম শুরুর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে সুপারিশ করা।

মূলত দক্ষিণ আফ্রিকার সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনার পরই এই প্রক্রিয়া সামনে এগোতে শুরু করেছে। গত সপ্তাহে দেশটির সাংবিধানিক আদালত রায় দেন যে, বহু আলোচিত ‘ফার্মগেট কেলেঙ্কারি’ নিয়ে তদন্ত আটকে দেওয়ার আগের সিদ্ধান্ত সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। এরপরই নতুন করে তদন্তের পথ খুলে যায়।

এই কেলেঙ্কারির সূত্রপাত ২০২০ সালে। সে সময় প্রেসিডেন্টের মালিকানাধীন ‘ফালা ফালা’ নামের একটি বাগানবাড়ি থেকে প্রায় ৪০ লাখ মার্কিন ডলার চুরির ঘটনা ঘটে। পরে জানা যায়, বিপুল পরিমাণ এই অর্থ বাড়ির সোফার ভেতরে লুকিয়ে রাখা ছিল। বিষয়টি প্রথমদিকে প্রকাশ্যে না এলেও ২০২২ সালে তা সামনে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়।

ঘটনাটি সামনে আসার পর থেকেই বিরোধীরা প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, এত বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রেসিডেন্ট কোথা থেকে পেয়েছিলেন এবং কেন তা ব্যাংকে না রেখে বাড়ির আসবাবের মধ্যে গোপন রাখা হয়েছিল। পাশাপাশি অভিযোগ ওঠে, পুরো বিষয়টি ধামাচাপা দিতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়েছে।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েই ক্ষমতায় এসেছিলেন প্রেসিডেন্ট রামাফোসা। ফলে তাঁর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ সামনে আসায় রাজনৈতিকভাবে বেশ চাপে পড়তে হয়েছে তাঁকে। বিরোধী দলগুলোর দাবি, এই অর্থের উৎস এখনো পরিষ্কার নয় এবং বিষয়টি জনসাধারণের কাছ থেকে গোপন রাখার চেষ্টা করা হয়েছে।

যদিও প্রেসিডেন্ট শুরু থেকেই কোনো ধরনের অনিয়ম বা অসদাচরণে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তিনি জানিয়েছেন, তিনি কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডে যুক্ত নন। তবে এত দিন পর নতুন করে তদন্ত শুরু হওয়ায় আবারও চাপের মুখে পড়েছেন তিনি।

গত সপ্তাহে আদালতের রায়ের প্রতিক্রিয়ায় প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনি বিচার বিভাগের সিদ্ধান্তকে সম্মান করেন। তবে একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, পদত্যাগের কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই। জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিয়ে যে স্বাধীন প্যানেলের প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে, সেটির বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন।

ওই প্রতিবেদনে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ‘অসদাচরণের প্রাথমিক প্রমাণ’ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। এরপর থেকেই বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসনের দাবি আরও জোরালোভাবে তুলতে শুরু করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, তদন্ত কমিটির কার্যক্রম কয়েক মাস পর্যন্ত চলতে পারে। কমিটি যদি প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে নেতিবাচক পর্যবেক্ষণও দেয়, তারপরও তাঁকে পদচ্যুত করা সহজ হবে না। কারণ দক্ষিণ আফ্রিকার সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্টকে অপসারণ করতে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন।

এদিকে প্রেসিডেন্টের দল আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস বা এএনসি এখনো পার্লামেন্টে উল্লেখযোগ্য শক্ত অবস্থানে রয়েছে। যদিও ২০২৪ সালের নির্বাচনে দলটি সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়, তারপরও এক-তৃতীয়াংশের বেশি আসন তাদের দখলে রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রেসিডেন্টকে অভিশংসন করা সহজ হবে না বলেই মনে করছেন অনেকে।

তবে এই কেলেঙ্কারি দেশটির রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে। দুর্নীতিবিরোধী অবস্থানের কারণে যিনি একসময় জনসমর্থন পেয়েছিলেন, এখন তাকেই নিজের স্বচ্ছতা প্রমাণের কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনীতিতে এই তদন্ত আগামী কয়েক মাসে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed