ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধ ও হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা বিশ্ব জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে তেল ও গ্যাস আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর। বিশেষ করে দরিদ্র দেশগুলো বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ের চাপে নতুন সংকটে পড়েছে। তবে এই বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস উৎপাদনকারী দেশই হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
হরমুজ প্রণালি কার্যত দুই দিক থেকেই অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, কুয়েত ও বাহরাইনের মতো দেশগুলো বৈশ্বিক বাজারে তেল রপ্তানি করে বিপুল অর্থনৈতিক শক্তি অর্জন করেছিল। কিন্তু এখন সেই রপ্তানি ব্যবস্থাই বড় ধাক্কার মুখে।
বিশেষ করে কুয়েত ও বাহরাইনের মতো দেশগুলো কার্যত বিশ্ববাজারে তেল বিক্রি করতে পারছে না। অন্যদিকে সৌদি আরব ও ইরাক সীমিত পাইপলাইন ব্যবস্থার মাধ্যমে উৎপাদনের একটি অংশ সরবরাহ করতে পারছে। ফলে বিশ্ববাজারে বিকল্প জ্বালানি সরবরাহকারীর প্রয়োজনীয়তা বেড়ে গেছে। সেই সুযোগই কাজে লাগাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি এক বড় অর্থনৈতিক সুযোগে পরিণত হয়েছে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে থাকা জ্বালানি উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে এখন সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী ওয়াশিংটন। ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো এখন পারস্য উপসাগরীয় জ্বালানির বিকল্প খুঁজতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। এতে মার্কিন তেলের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।
শুধু অপরিশোধিত তেল নয়, ডিজেল, কেরোসিন ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদাও বেড়েছে। জ্বালানির ঘাটতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের দামও বেড়েছে কয়েক গুণ। আর এই উচ্চমূল্যের বাজারে মার্কিন জ্বালানি কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির দৈনিক তেল রপ্তানি এখন ৬০ লাখ ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা নতুন রেকর্ড। ইরান সংঘাত শুরুর আগের সময়ের তুলনায় এই পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ। অপরিশোধিত তেলের সঙ্গে পরিশোধিত জ্বালানি যুক্ত করলে মোট রপ্তানি দাঁড়িয়েছে দৈনিক প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেলে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম যুক্তরাষ্ট্র নিট অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক হিসেবে এতটা শক্ত অবস্থানে পৌঁছেছে। অথচ ২০১৪ সালের আগপর্যন্ত দেশটি কার্যত বড় পরিসরে তেল রপ্তানি করত না। ফ্র্যাকিং প্রযুক্তির বিকাশের মাধ্যমেই এই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে।
এই প্রযুক্তির মাধ্যমে পাথরের স্তর ভেঙে শেল থেকে তেল ও গ্যাস উত্তোলন করা হয়। পানি, বালু ও রাসায়নিকের মিশ্রণ ব্যবহার করে পরিচালিত এই প্রক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতে আমূল পরিবর্তন এনেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র শুধু তেল নয়, এলএনজি বাজারেও সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। কারণ বিশ্বের শীর্ষ এলএনজি রপ্তানিকারক কাতার এখন বড় ধরনের সংকটে রয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশটির রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে।
এর পাশাপাশি ইরানের পাল্টা হামলায় কাতারের গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র রাস লাফান কমপ্লেক্সে হামলার ঘটনায় ভবিষ্যৎ উৎপাদন নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানি নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির এলএনজি রপ্তানি সক্ষমতা প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। নতুন পাঁচটি বড় প্রকল্প চালু হলে এই প্রবৃদ্ধি আরও বাড়বে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও এর প্রভাব পড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় দেশটির সাধারণ ভোক্তারাও বাড়তি ব্যয়ের মুখে পড়েছেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন জ্বালানির গড় মূল্য ৪ দশমিক ৫০ ডলারে পৌঁছেছে।
গবেষকেরা বলছেন, স্বল্পমেয়াদে এই পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হলেও দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বৈদ্যুতিক যানবাহনের বিস্তার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির চাহিদা বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে তেল ও গ্যাসের বাজার নতুন বাস্তবতায় প্রবেশ করবে।
তারপরও বর্তমান বাস্তবতায় ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট যত গভীর হচ্ছে, ওয়াশিংটনের জ্বালানি আধিপত্য ততই আরও সুসংহত হচ্ছে।





Add comment