খামেনির দেশে আইফোন দামে রেকর্ড ধাক্কা

ইরানে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে চলমান সামরিক উত্তেজনা, ফলে দেশটির অর্থনীতি এখন গভীর সংকটে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাতের প্রভাবে বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে, আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। লাখ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়ে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, আর যারা কাজ করছেন তারাও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন।

চলতি সপ্তাহের শুরু থেকেই বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে বড় ধরনের বৃদ্ধি দেখা গেছে। খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ, যানবাহন, বৈদ্যুতিক পণ্য এবং পেট্রোকেমিক্যাল সামগ্রী—সবকিছুর দাম আগের সপ্তাহের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত কমে যাচ্ছে।

এই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে প্রযুক্তিপণ্যের বাজার। যুক্তরাষ্ট্রে যেখানে একটি স্মার্টফোনের দাম প্রায় ১ হাজার ২০০ ডলার, সেখানে তেহরানের কিছু দোকানে একই ডিভাইসের দাম পৌঁছেছে প্রায় ৫০০ কোটি রিয়ালে, যা প্রায় ২ হাজার ৭৫০ ডলারের সমান। অনেক বিক্রেতা আবার এই পণ্য বিক্রিতেই অনাগ্রহ দেখাচ্ছেন, যা বাজারের অনিশ্চয়তার প্রতিফলন।

শুধু প্রযুক্তিপণ্য নয়, গাড়ির বাজারেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। জনপ্রিয় একটি ফরাসি মডেলের গাড়ি, যা ইরানেও উৎপাদিত হয়, তার দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩ হাজার কোটি রিয়ালে। ফলে এই গাড়ি এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। আমদানি করা গাড়ির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও কঠিন, যেখানে দাম কখনো কখনো প্রতিবেশী দেশের তুলনায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত বেশি চাওয়া হচ্ছে।

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনও স্বীকার করেছে, গাড়ির বাজারে প্রতিদিনই দাম বাড়ছে। তবে তারা এর পেছনে মূল্যস্ফীতির মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব এবং কিছু বিক্রেতার অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতাকে দায়ী করেছে।

বর্তমানে দেশটিতে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ১৭ কোটি রিয়ালেরও কম, যা ডলারে রূপান্তর করলে প্রায় ৯২ ডলারের কাছাকাছি। সরকার সাম্প্রতিক সময়ে এই মজুরি প্রায় ৬০ শতাংশ বাড়ালেও তা বাস্তব বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে মাথাপিছু ভর্তুকিও মাসে ১০ ডলারের কম।

তেহরানের এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বেতন ও বাজারদরের মধ্যে কোনো বাস্তব সম্পর্ক নেই। তাঁর ভাষ্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষ বাধ্য হয়ে এমন পণ্য কিনছেন, যার দাম ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অর্থনীতির এই সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। স্থানীয় অব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোর ক্ষতি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং নৌ অবরোধের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের ইন্টারনেট শাটডাউন দেশটির অর্থনীতিকে আরও দুর্বল করে তুলেছে। প্রায় ৬৫ দিন ধরে চলা এই শাটডাউন ব্যবসা-বাণিজ্যে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।

মুদ্রার অবমূল্যায়নও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। খোলাবাজারে ডলারের বিপরীতে রিয়ালের দর ক্রমাগত কমছে এবং নতুন রেকর্ড তৈরি করছে। প্রতি ডলারের বিপরীতে ১৮ লাখ ৪০ হাজার রিয়াল পর্যন্ত বিনিময় হার পৌঁছেছে। বাজারে অনিশ্চয়তার কারণে বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনও সীমিত হয়ে পড়েছে।

এ অবস্থায় বিক্রেতা ও ক্রেতা উভয়েই দোটানায় রয়েছেন। ভবিষ্যতে পণ্যের সরবরাহ থাকবে কি না বা দাম কোথায় গিয়ে থামবে—এ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। ফলে অনেক বিক্রেতা সুযোগ নিয়ে অস্বাভাবিকভাবে দাম বাড়াচ্ছেন, যা গত এক দশকের উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়েও খুব একটা দেখা যায়নি।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে বড় শিল্পকারখানা পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে কর্মী ছাঁটাই চলছে। তবে ঠিক কত মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এখনো নির্দিষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

এদিকে সর্বোচ্চ নেতৃত্বের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে সামরিক সক্ষমতার কথা তুলে ধরা হলেও অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়ে শক্ত থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। ব্যবসায়ীদের কর্মী ছাঁটাই কমানোরও আহ্বান জানানো হয়েছে।

ইরানের মুদ্রার পতনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর যেখানে এক ডলারের বিপরীতে প্রায় ৭০ রিয়াল পাওয়া যেত, বর্তমানে তা বেড়ে লাখের ঘর ছাড়িয়েছে। চার দশকে এই মুদ্রা কার্যত হাজার গুণ মূল্য হারিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা, মূল্যস্ফীতি এবং কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতাই এর প্রধান কারণ।

বিশ্বব্যাপী আর্থিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক চাপ দেশটির প্রবৃদ্ধিকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করেছে। গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে গেছেন, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তোলে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed