যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মেক্সিকান-আমেরিকান সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে সিনকো দে মায়ো উদযাপনকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠছে। প্রচলিতভাবে এই দিনে টাকো, মার্গারিটা এবং মারিয়াচি সংগীতের মাধ্যমে উৎসবের আবহ তৈরি হলেও এখন অনেক রেস্তোরাঁ মালিক ও ব্যবসায়ী মেক্সিকান ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরতে চাইছেন।
লস অ্যাঞ্জেলেসের কুয়েরনাভাকা’স গ্রিলের মালিক মেন্ডোজা জানিয়েছেন, তিনি এমন একটি উদযাপন আয়োজন করতে চান যা বর্তমান সময়ে সম্প্রদায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামকে প্রতিফলিত করে। তার রেস্তোরাঁয় এবারের সিনকো দে মায়ো উদযাপনে থাকবে ঐতিহ্যবাহী মারিয়াচি সংগীত, মেক্সিকান খাবার এবং একইসাথে ১৬০ বছরেরও বেশি আগে ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে পুয়েবলা যুদ্ধে মেক্সিকান সেনাদের ঐতিহাসিক বিজয়ের প্রতি বিশেষ সম্মান।
মেন্ডোজা বলেন, সীমিত সম্পদ নিয়ে মেক্সিকান সেনাদের সেই বিজয় তাদের দৃঢ়তা ও সহনশীলতার প্রতীক। তার মতে, সিনকো দে মায়ো কেবল উৎসব নয় বরং এটি সম্প্রদায়ের সংগ্রাম ও টিকে থাকার ইতিহাসকে স্মরণ করার একটি উপলক্ষ। তিনি আরও জানান, এই দিনটিকে তিনি “সমাজের বর্তমান বাস্তবতার সাথে সংযুক্ত একটি উদযাপন” হিসেবে দেখতে চান।
যুক্তরাষ্ট্রে মেক্সিকান আমেরিকান রেস্তোরাঁ মালিকদের মধ্যে এখন এই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি বাড়ছে। তারা চাইছেন উৎসবকে শুধুমাত্র পানীয় ও বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মেক্সিকান সংস্কৃতির আসল স্বাদ ও ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে। অনেক রেস্তোরাঁয় এখন অতিথিদের জন্য ঐতিহ্যবাহী “গিসাদোস” বা ধীরে রান্না করা মেক্সিকান স্ট্যু পরিবেশন করা হচ্ছে, যা সাধারণত পারিবারিক পরিবেশে খাওয়া হয়।
বারিরিয়া চালিও নামের একটি রেস্তোরাঁর মালিক জানান, তিনি চান মানুষ এমন খাবারের স্বাদ গ্রহণ করুক যা মেক্সিকান পরিবারের ঘরে অতিথি হয়ে গেলে পরিবেশন করা হয়। তার মতে, প্রকৃত ঐতিহ্যবাহী রান্না শুধু স্বাদেই নয় বরং সংস্কৃতির গভীরতাও প্রকাশ করে। তিনি বিশ্বাস করেন, এই ধরনের খাবার যেকোনো দর্শনার্থীকেই আকৃষ্ট করতে সক্ষম, তা তারা হিস্পানিক হোক বা না হোক।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে মেক্সিকান ও অন্যান্য হিস্পানিক মালিকানাধীন ব্যবসার অংশ উল্লেখযোগ্য। রেস্তোরাঁ খাতেও তাদের উপস্থিতি প্রায় এক-পঞ্চমাংশের কাছাকাছি। এই বাস্তবতা সিনকো দে মায়োকে আরও বড় একটি সাংস্কৃতিক ও ব্যবসায়িক সুযোগে পরিণত করেছে।
তবে কিছু ব্যবসায়ী মনে করেন, এই সুযোগের সঙ্গে দায়িত্বও আসে। একজন রেস্তোরাঁ কর্মী জানিয়েছেন, অতিথিদের আকৃষ্ট করার পাশাপাশি সংস্কৃতির সঠিক উপস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ভুলভাবে উপস্থাপিত স্টেরিওটাইপ বা অতিরঞ্জিত সাজসজ্জা আসল সংস্কৃতিকে আড়াল করে দিতে পারে। তাই এখন অনেক রেস্তোরাঁ সচেতনভাবে প্রামাণিকতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
সিনকো দে মায়ো মূলত ১৮৬২ সালে পুয়েবলা যুদ্ধে ফরাসি বাহিনীর বিরুদ্ধে মেক্সিকান সেনাদের বিজয়ের স্মরণে পালিত হয়। এই যুদ্ধ ছিল মেক্সিকোর জন্য একটি বড় প্রতীকী জয়, যেখানে কম সম্পদ নিয়েও তারা শক্তিশালী বাহিনীকে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়েছিল। মেক্সিকোতে এই দিনটি পুয়েবলা শহরে ঐতিহাসিক পুনর্নির্মাণ ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্মরণ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রে দিনটি মূলত মেক্সিকান আমেরিকান সংস্কৃতি উদযাপনের একটি উপলক্ষ হিসেবে গড়ে উঠেছে। এখানে প্যারেড, স্ট্রিট ফুড, মারিয়াচি প্রতিযোগিতা এবং ঐতিহ্যবাহী নৃত্য পরিবেশনার মাধ্যমে দিনটি পালন করা হয়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক সময় এই উৎসবের ইতিহাস ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয় এবং এটি মেক্সিকোর স্বাধীনতা দিবসের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা হয়, যা আসলে সেপ্টেম্বর মাসে পালিত হয়।
সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসন নীতি ও রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে লাতিনো সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর প্রভাব রেস্তোরাঁ শিল্পেও পড়েছে বলে ব্যবসায়ীরা জানান। তবুও মেন্ডোজার মতো অনেক উদ্যোক্তা তাদের প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক উদযাপনকে সামাজিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে দেখছেন।
এই প্রেক্ষাপটে তার রেস্তোরাঁতে এবারের আয়োজনের অংশ হিসেবে খাদ্য ও খেলনা সংগ্রহ অভিযানও রাখা হয়েছে, যা সংকটে থাকা মানুষের সহায়তায় ব্যবহার করা হবে। তার মতে, এটি শুধু ব্যবসা নয় বরং সম্প্রদায়ের প্রতি দায়বদ্ধতার প্রতিফলন।
মেন্ডোজা বলেন, এই উদযাপন তাদের পরিশ্রম, অর্জন এবং সাংস্কৃতিক গর্বের প্রতীক। তার কাছে সিনকো দে মায়ো কেবল একটি উৎসব নয়, বরং এটি টিকে থাকার ইতিহাস এবং ভবিষ্যতের প্রতি অঙ্গীকারের একটি প্রকাশ।





Add comment