পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনার শুরু থেকেই স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে রাজনৈতিক পালাবদলের। সোমবার সকাল আটটা থেকে ২৯৪ আসনের মধ্যে ২৯৩টির ভোট গণনা শুরু হতেই কেন্দ্রীয় শাসক দলের ধারাবাহিক অগ্রগতি চোখে পড়েছে। একটি আসনে পুনর্নির্বাচনের কারণে সেখানে গণনা হয়নি। সকাল গড়াতেই এই অগ্রগতি আরও সুসংহত হতে থাকে এবং দুপুর ১২টা পর্যন্ত সেই ধারা অব্যাহত থাকে।
শাসক দল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকলেও প্রতিপক্ষের এই এগিয়ে যাওয়াকে টপকে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারেনি। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে পশ্চিমবঙ্গে এই প্রথমবারের মতো কেন্দ্রীয় দলটির সরকার গঠনের সম্ভাবনা জোরালো হয়ে উঠেছে।
এতদিন উত্তরবঙ্গেই দলটির শক্তি বেশি ছিল, যা আগের নির্বাচনগুলোতেও প্রতিফলিত হয়েছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন এবং ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটে সেই প্রভাব স্পষ্ট ছিল। তবে এবার উত্তরবঙ্গের পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রথম দফায় উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গ মিলিয়ে ১৫২টি আসনে ভোট হয়েছিল। পাঁচ বছর আগে এই আসনগুলোর মধ্যে দলটি পেয়েছিল ৫৯টি এবং শাসক দল পেয়েছিল ৯০টি।
বর্তমান ট্রেন্ড বলছে, উত্তরবঙ্গের পাশাপাশি দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন জেলাতেও এবার এগিয়ে রয়েছে কেন্দ্রীয় দলটি। কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং ও কালিম্পংয়ের পাশাপাশি দুই মেদিনীপুর, বীরভূম, পুরুলিয়া এবং বাঁকুড়ায় ভালো ফলের ইঙ্গিত মিলছে।
দ্বিতীয় দফার নির্বাচনে দক্ষিণবঙ্গের সাত জেলার ১৪২টি আসনের মধ্যে আগেরবার দলটির সাফল্য ছিল সীমিত। মাত্র ১৮টি আসনে জয় পেয়েছিল তারা। কলকাতার ১১, হাওড়ার ১৬ এবং পূর্ব বর্ধমানের ১৬টি আসনের মধ্যে একটি আসনেও জয় পায়নি। তবে এবার গণনার প্রাথমিক পর্যায়ে কলকাতা ও হাওড়ায় তিনটি করে এবং পূর্ব বর্ধমানে একটি আসনে এগিয়ে থাকার খবর পাওয়া গেছে।
হুগলির ১৮টি আসনের মধ্যে আগেরবার চারটিতে জয় পেয়েছিল দলটি, কিন্তু এবার আটটিতে এগিয়ে রয়েছে। পশ্চিম বর্ধমানের নয়টি আসনের প্রতিটিতেই এগিয়ে থাকার চিত্র নজরে এসেছে, যা বিশ্লেষকদের কাছে অভূতপূর্ব হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দক্ষিণবঙ্গের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা, যেখানে শাসক দল বরাবরই শক্ত অবস্থানে ছিল, সেখানেও এবার প্রতিপক্ষের উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে। উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনার মোট ৬৪টি আসনের মধ্যে আগেরবার মাত্র ছয়টি পেয়েছিল কেন্দ্রীয় দলটি। এবার সেই সংখ্যা বেড়ে ১৪টিতে এগিয়ে রয়েছে।
পূর্ব মেদিনীপুরেও সবকটি আসনে এগিয়ে রয়েছে দলটি। নন্দীগ্রামে বিরোধী দলনেতা আগেরবার শাসক দলের প্রধানকে হারিয়েছিলেন, এবারও সেখানে তার জয় প্রায় নিশ্চিত বলে মনে করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে তিনি সাত হাজার ভোটে এগিয়ে আছেন। একইভাবে ভবানীপুরেও শাসক দলের প্রধানকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়েছে; শুরুতে পিছিয়ে থাকলেও পরে এগিয়ে গিয়ে আবারও পিছিয়ে পড়ার চিত্র দেখা গেছে।
উত্তর ২৪ পরগনা ও নদীয়ায় অপ্রত্যাশিত অগ্রগতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, নাগরিকত্ব ইস্যুতে মতুয়া সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ এখনো কেন্দ্রীয় দলের ওপর আস্থা রাখছে। নদীয়ার ১৭টি আসনের মধ্যে আগেরবার নয়টিতে জয় পেয়েছিল তারা, এবার আরও দুটি আসন বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নির্বাচন প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলোকেও এই ফলাফলের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ভোটার তালিকা সংশোধন, বিপুলসংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন, প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বদলি এবং গণনাকেন্দ্র পরিচালনায় কেন্দ্রীয় সংস্থার কর্মীদের যুক্ত করার মতো পদক্ষেপ ভোটের পরিবেশে প্রভাব ফেলেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
এতে একদিকে ভোটাররা নিরাপদ বোধ করেছেন, অন্যদিকে কিছু ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব ইস্যুর আশঙ্কায় অনাগ্রহী ভোটাররাও ভোট দিতে এগিয়ে এসেছেন। ফলে ভোটের হার ৯৩ থেকে ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা উল্লেখযোগ্য।
দীর্ঘ ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার কারণে শাসক দলের বিরুদ্ধে যে স্বাভাবিক জনঅসন্তোষ তৈরি হয়, সেটিকেও প্রতিপক্ষ নির্বাচনী প্রচারে কাজে লাগিয়েছে। পাশাপাশি নগদ সহায়তার রাজনীতির পাল্টা হিসেবে তারা সামাজিক সহায়তা ভিত্তিক কৌশল প্রয়োগ করেছে।
দুপুরের মধ্যেই রাজ্যজুড়ে সমর্থকদের উদযাপন শুরু হয়ে যায়। মুসলিম ভোট একদিকে একত্রিত হবে বলে ধারণা থাকলেও বাস্তবে তা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে বলে ট্রেন্ডে ইঙ্গিত মিলছে।
সব মিলিয়ে বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, এই নির্বাচনের ফলাফল শুধু রাজ্য রাজনীতিতেই নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। অঙ্গ ও কলিঙ্গের পর বঙ্গ জয় হলে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ভারসাম্য আরও একপেশে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা জোরালো হয়ে উঠছে।





Add comment