যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যে নতুন একটি আইনকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ ও বিতর্ক বাড়ছে। আইনটি কার্যকর হলে সরকারি চিকিৎসা সহায়তা কর্মসূচিতে নিবন্ধিত শত শত অনথিভুক্ত অভিবাসী শিশুর তথ্য রাজ্যের অভিবাসন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। এতে গুরুতর অসুস্থতা ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতায় ভোগা অনেক শিশুর চিকিৎসা সেবা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে সতর্ক করছেন অভিভাবক, চিকিৎসক ও মানবাধিকারকর্মীরা।
সম্প্রতি শত শত পরিবার একটি চিঠি পেয়েছে, যেখানে জানানো হয়েছে যে তারা যদি ৩০ জুনের পরও টেনেসি ডিপার্টমেন্ট অব হেলথ পরিচালিত ‘চিলড্রেনস স্পেশাল সার্ভিসেস’ কর্মসূচির আওতায় চিকিৎসা নিতে চায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট শিশুদের অভিবাসন-সংক্রান্ত তথ্য রাজ্যের সেন্ট্রালাইজড ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট ডিভিশনের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এই কর্মসূচিটি মূলত স্বল্প আয়ের পরিবারগুলোর জন্য পরিচালিত হয়। অস্ত্রোপচার, ওষুধ, পুনর্বাসন সেবা এবং অন্যান্য ব্যয়বহুল চিকিৎসার খরচ বহনে সহায়তা করে এটি। অনেক পরিবারের জন্য এটি শেষ ভরসা হিসেবে বিবেচিত।
একজন হন্ডুরান বংশোদ্ভূত মা জানান, চিঠিটি পাওয়ার পর তিনি বারবার পড়ে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করেছেন যে তিনি ঠিক বুঝেছেন কি না। তাঁর ১২ বছর বয়সী মেয়ে সেরিব্রাল পালসি, মৃগীরোগ এবং জন্মগত হৃদরোগে আক্রান্ত। নতুন আইন কার্যকর হলে মেয়ের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া নিয়ে তিনি গভীর উদ্বেগে রয়েছেন।
মায়ের ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়েটির জীবনরক্ষাকারী হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচারের খরচ অতীতে এই কর্মসূচি বহন করেছিল। বর্তমানে মৃগীরোগ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ, হৃদরোগ ও স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, হুইলচেয়ার, শারীরিক থেরাপি এবং বাকশক্তি উন্নয়নের থেরাপির জন্যও এই সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়। তিনি বলেন, একটি থেরাপি সেশনের খরচই হাজার ডলারের বেশি হতে পারে।
নতুন আইনের ফলে প্রায় ৪০০ অভিবাসী শিশু চিকিৎসা সুবিধা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মে মাসে অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতারা এমন একটি আইন অনুমোদন করেন, যেখানে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগকে যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে অবস্থান না করা ব্যক্তিদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্ট তথ্য রিপোর্ট করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
তবে আইনের সমর্থকদের দাবি, এতে জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সেবা থেকে কোনো শিশুকে বঞ্চিত করা হবে না। বিলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা এক বিবৃতিতে বলেছেন, জরুরি ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে ফেডারেল সুরক্ষা ব্যবস্থা বহাল থাকবে। তাঁর মতে, এই আইন কেবল করদাতাদের অর্থে পরিচালিত সুবিধাগুলো আইনগতভাবে যোগ্য ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করবে।
অন্যদিকে অভিভাবকদের মতে, তারা এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। কর্মসূচি থেকে সন্তানকে সরিয়ে নিলে চিকিৎসা ব্যয় বহন করা সম্ভব হবে না। আবার কর্মসূচিতে থাকলে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
টেনেসি স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে কর্মসূচিটি ৪ হাজার ৬৪০ শিশুর চিকিৎসা সহায়তায় প্রায় ২১ লাখ ৯০ হাজার ডলার ব্যয় করেছে। এ অর্থের একটি অংশ রাজ্য সরকার এবং অন্য অংশ ফেডারেল অনুদান থেকে আসে।
একজন শিশু বিশেষজ্ঞ ও সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, এই কর্মসূচির মাধ্যমে অসংখ্য শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। তাঁর মতে, চিকিৎসা সেবায় সামান্য ব্যাঘাতও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তা প্রাণঘাতীও হতে পারে।
মঙ্গলবার আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিবার, চিকিৎসক ও অভিবাসী অধিকারকর্মীরা গভর্নরের প্রতি আহ্বান জানান, যাতে অনথিভুক্ত শিশুদের চিকিৎসা সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। যদিও গভর্নর ইতোমধ্যে বিলটিতে স্বাক্ষর করে এটিকে আইনে পরিণত করেছেন।
অভিবাসী অধিকারবিষয়ক একটি সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক বলেন, অসুস্থ ও ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্য দিতে হচ্ছে। তাঁদের মতে, আইনের বাস্তব প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
এদিকে টেনেসি জাস্টিস সেন্টার তিনজন চিকিৎসকের পক্ষে আদালতে মামলা করেছে। সংগঠনটির দাবি, নতুন আইন কার্যকর হওয়ার আগে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা প্রয়োজন। কারণ, কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল অনেক শিশু খুব শিগগিরই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা হারাতে পারে।
সংগঠনটির নির্বাহী পরিচালক এক বিবৃতিতে বলেন, যখন চিকিৎসকেরা সতর্ক করছেন যে চিকিৎসায় সামান্য বিরতিও ক্ষতিকর কিংবা প্রাণঘাতী হতে পারে, তখন শিশুদের আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলা নয়, বরং তাদের সুরক্ষা দেওয়াই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হওয়া উচিত।





Add comment