লোহিত সাগর দিয়ে সৌদি আরব থেকে জ্বালানি তেল পরিবহনে একটি বিশাল পাইপলাইন রয়েছে, যার নাম ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন। গত বৃহস্পতিবার এই পাইপলাইনে ড্রোন হামলা হয়, এরপর সৌদি সরকার পাইপলাইনটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধের ঘোষণা দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, হামলার জেরে পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ার এই ঘটনা বৈশ্বিক জ্বালানি তেল বাজারের জন্য নতুন এক ধাক্কা।
এই পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার বা ৭৪৬ মাইল, যা পেট্রোলাইন নামেও পরিচিত। ১৯৮১ সালে নির্মিত এই পাইপলাইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্র থেকে উত্তোলিত জ্বালানি তেল পুরো আরব উপদ্বীপ পেরিয়ে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে নিয়ে যাওয়া, যাতে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল পরিবহন করা যায়। পাইপলাইনটি দিয়ে দৈনিক সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত জ্বালানি তেল পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে, যদিও সাম্প্রতিক মাসগুলোয় এর ব্যবহার অনেকটাই কমে গিয়েছিল।
বাজার বিশ্লেষণকারী একটি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে এই পাইপলাইন দিয়ে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়েছে, যা জানুয়ারির পর সর্বনিম্ন মাসভিত্তিক পরিবহনের রেকর্ড। হুতিদের ধারাবাহিক হামলার কারণে লোহিত সাগর হয়ে জ্বালানি তেল পরিবহন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে বলেই এই পরিমাণ কমেছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর প্রথম পাঁচ মাসে চিত্রটি ছিল ভিন্ন। ওই সময় সৌদি আরব এই পাইপলাইন দিয়ে তেল সরবরাহ বাড়িয়ে দৈনিক প্রায় ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেলে নিয়ে গিয়েছিল, যা বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমান। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে সৌদি আরব এই পাইপলাইনের সুবাদেই রপ্তানি কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে পেরেছিল।
পাইপলাইনটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, এর জবাবে ইরানও প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালায়, ফলে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তখন থেকেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে সৌদি আরবের জ্বালানি তেল পরিবহনে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের গুরুত্ব আরও অনেক বেড়ে গেছে।
সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে হামলার ফলে ক্ষয়ক্ষতি ও হতাহতের ঘটনার পরই সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ রাখা হয়েছে। একই সময়ে ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিরা লোহিত সাগর অঞ্চলে হামলা আরও জোরদার করেছে এবং বাব আল-মানদেব প্রণালিতে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে এই অতিগুরুত্বপূর্ণ জলপথ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের ওপর সৌদি আরবের নির্ভরতা আরও বেড়ে গেছে, আর ঠিক এই সময়েই পাইপলাইনটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া কতটা প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে চলছে ব্যাপক আলোচনা।
বাজারে সম্ভাব্য প্রভাব
ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি বৈশ্বিক জ্বালানি তেল বাজারের জন্য একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর সময়ে ঘটেছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশের বেশি, অর্থাৎ দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল সরবরাহ হতো। বর্তমানে এই প্রণালি দিয়ে দৈনিক মাত্র ৬০ থেকে ৯০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হচ্ছে বলে একটি হিসাবে উঠে এসেছে, অর্থাৎ পরিবহনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে সৌদি আরব বিকল্প পথ হিসেবে লোহিত সাগরকেই বেছে নিয়েছিল এবং ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনের মাধ্যমে আরও বেশি তেল সেদিকে পাঠানোর চেষ্টা করছিল। তবে পুরো রপ্তানি প্রক্রিয়া নির্ভর করছে পাইপলাইন, মজুতাগার ও তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ওপর, যা যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ক্রমাগত ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একটি ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাতে জানা গেছে, পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও ইয়ানবুতে বিদ্যমান তেলের মজুত দিয়ে সৌদি আরব আরও পাঁচ থেকে সাত দিন রপ্তানি অব্যাহত রাখতে পারবে। এ ছাড়া মিসরের দুটি স্থানে সৌদি আরবের বাড়তি তেল মজুতের ব্যবস্থা থাকায় আরও কিছুদিন রপ্তানি কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে বলে জানা গেছে, ফলে পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশটির হাতে কিছুটা সময় রয়েছে।
সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে শঙ্কা
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের মজুত ইতিমধ্যে অনেকটাই কমে এসেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার প্রভাবে গত মাসে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ গত তিন দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ দৈনিক প্রায় ৫৭ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত কমতে পারে, যা মোট বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ৬ শতাংশের সমান।
এই সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশ তাদের কৌশলগত মজুত থেকে বাড়তি তেল সরবরাহ করেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম এখনো পর্যন্ত রেকর্ড পরিমাণ বাড়েনি। সাম্প্রতিক মাসগুলোয় আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম মোটামুটি ৭০ থেকে ৯০ ডলারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যে সরবরাহ যত কমবে, মজুতও তত কমতে থাকবে, আর মজুত কমে গেলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
গত জুনে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছিল, কৌশলগত মজুত থেকে এভাবে ক্রমাগত তেল সরবরাহ চালিয়ে যাওয়া হলে তা একসময় সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মজুত অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠে যেতে পারে।
ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশ্লেষকেরা। পাশাপাশি ইয়ানবু বন্দর ও সংশ্লিষ্ট তেল পরিবহনপথে হামলার হুমকি দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত থাকলে, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে কমে যাওয়া রপ্তানির ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সৌদি আরবের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে। হংকংভিত্তিক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সতর্ক করে বলেছে, হুতিদের ড্রোন হামলার হুমকির মুখে দৈনিক ১০ লাখ ব্যারেলের বেশি তেল প্রক্রিয়াজাতকারী ইয়ানবু কেন্দ্রটি যদি সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে, তাহলে তা বিশ্বের জন্য একটি ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।





Add comment