একসময় জায়গাটি ছিল প্রায় অনুর্বর। ঘাস ও পাথর ছাড়া সেখানে তেমন কোনো উদ্ভিদ দেখা যেত না। সেই জমিতেই একসময় ফেলে দেওয়া হয়েছিল ১২ হাজার টন কমলার খোসা ও পাল্প। কিন্তু ১৬ বছর পর সেখানে গিয়ে গবেষকেরা যে পরিবর্তন দেখতে পান, তা তাঁদেরও বিস্মিত করে। একসময় অনুর্বর থাকা জমিটি ঘন গাছপালা ও লতায় ভরে উঠেছিল। এমনকি রাস্তার পাশে থাকা বড় একটি সাইনবোর্ডও গাছপালার আড়ালে প্রায় পুরোপুরি ঢাকা পড়ে গিয়েছিল।
অদ্ভুত এই ঘটনাটি ঘটেছিল মধ্য আমেরিকার দেশ কোস্টারিকার একটি জাতীয় উদ্যানে। গবেষণায় দেখা যায়, যে প্রায় তিন হেক্টর জমিতে কমলার খোসা ও পাল্প ফেলা হয়েছিল, সেখানে গাছের বায়োমাস ১৭৬ শতাংশ বেড়ে যায়। শুধু গাছের পরিমাণই নয়, ওই জমির মাটির গুণমান, উদ্ভিদের বৈচিত্র্য এবং বনের ঘনত্বও পাশের জমির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল।
কীভাবে এত বড় পরিবর্তন সম্ভব হলো, তার পেছনে রয়েছে খাদ্যশিল্পের বর্জ্য ব্যবহারের একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।
কমলার বর্জ্য ফেলার পরিকল্পনা
ঘটনাটি শুরু হয় ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে। কোস্টারিকার উত্তর সীমান্তের কাছে তখন ডেল অরো নামের একটি প্রতিষ্ঠান কমলার জুস উৎপাদনের কারখানা চালু করে। একই সময়ে পরিবেশবিদ ড্যানিয়েল জানজেন ও উইনি হলভাক্স কোস্টারিকার গুয়ানাকাস্তে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে কাজ করছিলেন।
পরিবেশবিদেরা তখন ডেল অরোকে একটি প্রস্তাব দেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি যদি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জন্য কিছু বনভূমি দান করে, তাহলে জাতীয় উদ্যানের ক্ষতিগ্রস্ত একটি জমিতে তাদের কমলার খোসা ও অন্যান্য জৈব বর্জ্য ফেলার অনুমতি দেওয়া হবে। এসব জৈব বর্জ্য সময়ের সঙ্গে পচে মাটির সঙ্গে মিশে যাবে এবং জমির পরিবেশ পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখবে, এমনটাই ছিল পরিকল্পনা।
ডেল অরো সেই প্রস্তাবে সম্মতি দেয়। ১৯৯৭ সালে চুক্তি হওয়ার পর প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন কমলার খোসা ও পাল্প ট্রাকে করে নিয়ে গিয়ে অনুর্বর জমিতে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু এই উদ্যোগ বেশিদিন নির্বিঘ্নে চলেনি। এক বছরের মধ্যেই বিষয়টি আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়ে।
প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের মামলা
ডেল অরোর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান টিকোফ্রুট অভিযোগ তোলে, জাতীয় উদ্যানে বিপুল পরিমাণ কমলার বর্জ্য ফেলে জমিটি নষ্ট করা হয়েছে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত কোস্টারিকার সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছে যায়।
আদালত টিকোফ্রুটের পক্ষে রায় দেন। এরপর প্রায় ১৫ বছর ওই জায়গাটির বিষয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি। কমলার খোসা ও পাল্প ফেলে রাখা জমিটিও অনেকটা বিস্মৃত হয়ে যায়।
২০১৩ সালে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক টিমোথি ট্রয় পরিবেশবিদ ড্যানিয়েল জানজেনের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি গবেষণার বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। সেই সময় পুরোনো ওই কমলার খোসা ফেলার জায়গাটির প্রসঙ্গ আবার সামনে আসে।
গবেষক সেখানে গিয়ে যে দৃশ্য দেখতে পান, তা তাঁর প্রত্যাশার চেয়েও বেশি বিস্ময়কর ছিল। জায়গাটি ঘন গাছপালা ও লতায় এমনভাবে ঢেকে গিয়েছিল যে রাস্তার পাশে থাকা প্রায় ৭ ফুট লম্বা উজ্জ্বল হলুদ সাইনবোর্ডটিও গাছের আড়ালে চলে গিয়েছিল। ফলে রাস্তা থেকে সেটি প্রায় দেখাই যাচ্ছিল না।
পাশের জমির সঙ্গে গবেষণা
এরপর গবেষকেরা জানতে চাইলেন, এত বড় পরিবর্তনের পেছনে সত্যিই কি কমলার খোসা ও পাল্পের ভূমিকা রয়েছে? বিষয়টি নিশ্চিত করতে তাঁরা কমলার বর্জ্য ফেলা জমিটির সঙ্গে রাস্তার অপর পাশে থাকা একই ধরনের একটি জমির তুলনা করেন।
দুই জায়গাতেই গাছের সংখ্যা, আকার এবং প্রজাতি পরিমাপ করা হয়। একই সঙ্গে জমির মাটির নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা চালানো হয়। গবেষণার ফলাফল থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, দুই জমির পরিবেশগত অবস্থার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
কমলার খোসা ও পাল্প ফেলা জমির মাটি ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি পুষ্টিসমৃদ্ধ। সেখানে গাছের বায়োমাসও বেশি পাওয়া যায়। পাশাপাশি গাছের প্রজাতির বৈচিত্র্য এবং বনের ওপরের সবুজ ছাউনিও ছিল বেশি ঘন।
অর্থাৎ যে কমলার খোসা ও পাল্প একসময় খাদ্যশিল্পের বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, সেটিই দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে একটি অনুর্বর জমির পরিবেশ বদলে দিতে ভূমিকা রেখেছিল। ধীরে ধীরে সেখানে উদ্ভিদের বৃদ্ধি বাড়ে এবং জমিটি ঘন সবুজ এলাকায় পরিণত হয়।
বর্জ্য থেকে পরিবেশ পুনরুদ্ধার
প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের এই গবেষণা পরে ‘রেস্টোরেশন ইকোলজি’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। গবেষণাটির অন্যতম লেখক টিমোথি ট্রয়ের মতে, কৃষি ও খাদ্যশিল্প থেকে উৎপন্ন বর্জ্য ব্যবহার করে বন পুনরুদ্ধারের এমন উদাহরণ খুব বেশি নেই।
কোস্টারিকার এই ঘটনা খাদ্য উৎপাদনের সঙ্গে পরিবেশের সম্পর্ক নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক সামনে আনে। মানুষের কাছে কোনো উপাদান অপ্রয়োজনীয় বা বর্জ্য মনে হলেও প্রকৃতির জন্য সেটি সবসময় মূল্যহীন নয়। উপযুক্ত পরিবেশে জৈব বর্জ্য মাটির সঙ্গে মিশে তার গুণমান পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে এবং উদ্ভিদের বৃদ্ধির পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
প্রিন্সটনের পরিবেশবিদ ডেভিড উইলকোভ বলেন, মানুষের প্রয়োজনীয় পণ্য উৎপাদন করতে গিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো অনেক সময় পরিবেশগত সমস্যাও তৈরি করে। তবে একই প্রতিষ্ঠান ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা যদি একসঙ্গে কাজ করেন, তাহলে সেই সমস্যার কিছু অংশ সমাধানের পথও তৈরি হতে পারে।
কোস্টারিকার ওই জমির পরিবর্তন তাই শুধু একটি অনুর্বর জায়গা সবুজ হয়ে ওঠার ঘটনা নয়। এটি দেখিয়েছে, সঠিক ব্যবস্থাপনায় খাদ্যশিল্পের বর্জ্যও কখনো কখনো পরিবেশ পুনরুদ্ধারের কাজে ব্যবহার করা সম্ভব। ১৬ বছর আগে যে কমলার খোসা ও পাল্পকে বর্জ্য হিসেবে ফেলে রাখা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে সেটিই সেই জমির মাটি, গাছপালা ও বনভূমির চেহারায় বড় পরিবর্তন এনে দেয়।





Add comment