বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হিসেবে ইতিহাস গড়েছিলেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক। তবে সেই মর্যাদা দীর্ঘস্থায়ী হলো না। মাত্র ১২ দিনের মাথায় শেয়ারবাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা এবং প্রযুক্তি খাতের শেয়ারের দরপতনের কারণে তিনি আবারও ট্রিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে এসেছেন। ফলে বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার রেকর্ড ধরে রাখলেও বর্তমানে তিনি আর সেই তালিকায় নেই।
বুধবার মার্কিন শেয়ারবাজারে লেনদেন শেষ হওয়ার পর প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ কমে ৯৭০ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ তাঁর সম্পদ এখন আবার বিলিয়নিয়ার পর্যায়ে ফিরে এসেছে। যদিও এ বিপুল সম্পদের পরিমাণ তাঁকে এখনো বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি হিসেবে ধরে রেখেছে।
বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদ অর্জনের কৃতিত্ব আসে স্পেসএক্সের ঐতিহাসিক প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে। গত ১২ জুন মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর এক লাফে মাস্কের সম্পদের পরিমাণ ট্রিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করে। রকেট, স্যাটেলাইট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় তাঁর সম্পদও রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়।
স্পেসএক্সের আইপিও ইতিহাসের অন্যতম বড় তহবিল সংগ্রহের ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রথম ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই কোম্পানিটির শেয়ারের দাম প্রাথমিক ১৩৫ ডলার থেকে প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়ে যায়। এর প্রভাব সরাসরি পড়ে মাস্কের ব্যক্তিগত সম্পদের ওপর।
আইপিওর পরবর্তী কয়েক দিন ও সপ্তাহে তাঁর সম্পদ ট্রিলিয়ন ডলারের আশপাশে অবস্থান করলেও চলতি সপ্তাহে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে বড় ধরনের ধস পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের সম্ভাব্য সুদহার বৃদ্ধির আশঙ্কা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে অতিরিক্ত মূল্যায়ন বা সম্ভাব্য ‘বাবল’ নিয়ে উদ্বেগ বাজারে চাপ সৃষ্টি করেছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিনির্ভর কোম্পানিগুলোর শেয়ারের মূল্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে বিশ্বের বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপরও। বাজারের সামগ্রিক নেতিবাচক প্রবণতা স্পেসএক্স ও টেসলার মতো প্রতিষ্ঠানের শেয়ারমূল্যেও চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে কমে যায় মাস্কের সম্পদের পরিমাণ।
সর্বশেষ লেনদেন শেষে স্পেসএক্সের প্রতিটি শেয়ারের মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৫৪ দশমিক ৩৫ ডলার। যদিও এটি এখনো আইপিওর ভিত্তিমূল্যের চেয়ে বেশি, তবু সাম্প্রতিক বাজার অস্থিরতা মাস্কের সম্পদে বড় প্রভাব ফেলেছে। কারণ তাঁর অধিকাংশ সম্পদ নগদ অর্থ নয়, বরং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও মালিকানার ওপর নির্ভরশীল। ফলে শেয়ারের দাম ওঠানামা করলেই তাঁর সম্পদের পরিমাণেও বড় পরিবর্তন দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, মাস্কের সম্পদের উত্থান-পতন আধুনিক অর্থনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম নজিরবিহীন ঘটনা। কারণ অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর সম্পদ কয়েকশ বিলিয়ন ডলার বাড়া বা কমার মতো ঘটনা ঘটছে, যা অতীতে খুব কম দেখা গেছে।
ট্রিলিয়নিয়ার খেতাব হারালেও বিশ্বের শীর্ষ ধনীর অবস্থান এখনো তাঁর হাতেই রয়েছে। ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর পরেই অবস্থান করছেন গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা পেজ, যার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২৮৪ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মাস্কের সম্পদ এখনো তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় অনেক বেশি।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত মাস্কের সম্পদে প্রায় ৩৩৮ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হয়েছে। এই অঙ্কটি বিশ্বের দ্বিতীয় ধনী ব্যক্তির মোট সম্পদের চেয়েও বেশি। ফলে ট্রিলিয়নিয়ার মর্যাদা সাময়িকভাবে হারালেও সম্পদ বৃদ্ধির দিক থেকে তিনি এখনো অনন্য অবস্থানে রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, শেয়ারবাজারে ইতিবাচক প্রবণতা ফিরে এলে এবং স্পেসএক্স বা টেসলার শেয়ারের মূল্য আবার বাড়তে শুরু করলে মাস্ক খুব দ্রুতই ট্রিলিয়ন ডলারের সম্পদের মালিক হিসেবে ফিরে আসতে পারেন। তাই বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ারের খেতাব আপাতত হারালেও তাঁর জন্য সেই অবস্থানে ফেরার পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।





Add comment