সূর্য থেকে নির্গত হওয়া শক্তিশালী সৌর শিখা নিয়ে নতুন করে সতর্ক করেছেন মহাকাশবিজ্ঞানীরা। তাঁদের আশঙ্কা, এই সৌর শিখার প্রভাবে পৃথিবীর কিছু অঞ্চলে বেতার যোগাযোগে সাময়িক বিঘ্ন দেখা দিতে পারে। একই সঙ্গে উত্তর গোলার্ধের বিভিন্ন এলাকায় আকাশজুড়ে চোখধাঁধানো মেরুজ্যোতি বা অরোরা দেখা যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। বর্তমানে সূর্যের একটি সক্রিয় সৌর কলঙ্ক অঞ্চল পৃথিবীর দিকে সরাসরি মুখ করে থাকায় পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন গবেষকেরা।
বিজ্ঞানীদের ভাষ্য অনুযায়ী, এআর৪৪৩৬ নামে পরিচিত সূর্যের একটি সক্রিয় সানস্পট অঞ্চল থেকেই এই সৌর শিখার উৎপত্তি হয়েছে। সূর্যের ঘূর্ণনের কারণে অঞ্চলটি এখন পৃথিবীমুখী অবস্থানে রয়েছে। এ ধরনের সৌর কলঙ্ক অঞ্চল সাধারণত প্রচণ্ড তাপ ও চৌম্বকীয় অস্থিরতার কারণে বিস্ফোরণমুখী হয়ে ওঠে। এর ফলেই সৌর শিখা বা সোলার ফ্লেয়ার তৈরি হয়, যা মহাশূন্যে বিপুল শক্তি ছড়িয়ে দেয়।
শুধু সৌর শিখাই নয়, একই সঙ্গে সূর্য থেকে করোনাল মাস ইজেকশন বা সিএমই নামের চার্জিত কণার বিশাল মেঘও মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়েছে। মহাকাশবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই কণার মেঘের মূল অংশটি পৃথিবীর পাশ দিয়ে চলে যেতে পারে। তবে এর সামান্য অংশও যদি পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের সংস্পর্শে আসে, তাহলেও ভূ-চৌম্বকীয় অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সৌর শিখাকে মহাকাশবিজ্ঞানের ভাষায় মাঝারি থেকে শক্তিশালী মাত্রার বলা হচ্ছে। সূর্য থেকে নির্গত তড়িৎ-চুম্বকীয় বিকিরণ আলোর গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এর প্রভাব পৃথিবীতে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগে না। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বর্তমানে মহাশূন্যে ছুটে চলা সিএমই প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার গতিতে অগ্রসর হচ্ছে।
মহাকাশ গবেষকদের ধারণা, যদি এই চার্জিত কণাগুলো পৃথিবীর চৌম্বক মণ্ডলে প্রবেশ করে, তাহলে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র সাময়িকভাবে অস্থির হয়ে উঠতে পারে। এর সরাসরি প্রভাব হিসেবে দেখা দিতে পারে মেরুজ্যোতি। সাধারণত পৃথিবীর মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি আকাশে এই আলোকচ্ছটা দেখা যায়। তবে শক্তিশালী সৌর ক্রিয়ার সময় তা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দক্ষিণাঞ্চলেও দৃশ্যমান হতে পারে।
যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উত্তর স্কটল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের উত্তরাঞ্চলে অরোরা দেখা যেতে পারে। একই ধরনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রেও। আকাশ পরিষ্কার থাকলে সেখানে সবুজ, লাল কিংবা হালকা বেগুনি রঙের ঢেউখেলানো আলোর দৃশ্য দেখা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মেরুজ্যোতি মূলত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের সঙ্গে সূর্য থেকে আসা চার্জিত কণার সংঘর্ষের ফল। যখন এই কণাগুলো পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে মেরু অঞ্চলের দিকে ধাবিত হয়, তখন বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন গ্যাসের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় আকাশে রঙিন আলোর সৃষ্টি হয়। এই প্রাকৃতিক ঘটনাই অরোরা নামে পরিচিত।
বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী ভয়াবহ কোনো ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের আশঙ্কা নেই। তবে বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থায় সাময়িক গোলযোগ দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির রেডিও যোগাযোগ কিছু সময়ের জন্য দুর্বল হয়ে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মহাকাশবিজ্ঞানীরা আরও জানিয়েছেন, সূর্য নিয়মিতভাবেই এ ধরনের শক্তি নির্গত করে থাকে। পৃথিবী মাঝেমধ্যে সেই শক্তির সরাসরি পথে চলে আসে বলেই এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। যদিও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা কম, তারপরও বৈজ্ঞানিক মহল বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌর শিখা ও সিএমই সম্পর্কিত এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে মহাকাশ প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট যোগাযোগ এবং বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে গবেষণা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। আপাতত সাধারণ মানুষের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগের কিছু না থাকলেও, আকাশে বিরল মেরুজ্যোতির দেখা মিলতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।





Add comment