বিশ্বজুড়ে আবারও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে হান্টাভাইরাস। ইঁদুরজাতীয় প্রাণীর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ভাইরাস নিয়ে বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ এবং এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবেই ভাইরাসটির অস্তিত্ব রয়েছে। যদিও সংক্রমণের ঘটনা তুলনামূলক কম, তবু কিছু ক্ষেত্রে এটি প্রাণঘাতী পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত হান্টাভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ আবিষ্কৃত হয়নি। ফলে রোগটি দ্রুত শনাক্ত করা এবং শুরুর দিকেই চিকিৎসা নেওয়াই আক্রান্ত ব্যক্তির সুস্থ হয়ে ওঠার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের ব্যাখ্যায়, হান্টাভাইরাস আসলে এক ধরনের ভাইরাস পরিবার, যা নির্দিষ্ট কিছু ইঁদুরের শরীরে স্বাভাবিকভাবেই বাস করে। মানুষ সাধারণত সংক্রমিত হয় তখনই, যখন ইঁদুরের প্রস্রাব, লালা কিংবা বিষ্ঠা থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাস কণা নিশ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে। যেসব এলাকায় ইঁদুরের উপদ্রব বেশি এবং বাতাস চলাচলের সুযোগ কম, সেখানে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অঞ্চলভেদে ভাইরাসটির ধরন ভিন্ন হতে পারে এবং তার ওপর নির্ভর করে রোগের প্রকৃতিও আলাদা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি ইঁদুর থেকেই মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। তবে কিছু নির্দিষ্ট প্রাদুর্ভাবের সময় সীমিত আকারে একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে সংক্রমণের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।
হান্টাভাইরাস শনাক্ত করা কঠিন হওয়ার অন্যতম কারণ হলো এর প্রাথমিক লক্ষণগুলো সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মতো। ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার এক থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে উপসর্গ প্রকাশ পেতে পারে। শুরুতে আক্রান্ত ব্যক্তির জ্বর, মাথাব্যথা, শরীরব্যথা, পেশিতে অস্বস্তি, বমি বমি ভাব, পেটে ব্যথা এবং বমির মতো সমস্যা দেখা দেয়। এসব উপসর্গ সাধারণ অসুস্থতার সঙ্গে মিলে যাওয়ায় অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি তৈরি হয়। কারণ প্রথমদিকে সাধারণ মনে হলেও রোগটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছাতে পারে। গুরুতর সংক্রমণের ক্ষেত্রে শ্বাসপ্রশ্বাসের জটিলতা তৈরি হতে পারে এবং রোগীকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখতে হতে পারে। শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজনও হতে পারে।
বর্তমানে চিকিৎসকেরা রোগটির জন্য নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক ব্যবহার করতে পারছেন না। তাই আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার ওপর ভিত্তি করে উপসর্গ নিয়ন্ত্রণের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শ্বাসপ্রশ্বাস স্বাভাবিক রাখা এবং শরীরে অক্সিজেনের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেহেতু এই ভাইরাসের মূল বাহক ইঁদুর, তাই প্রতিরোধ ব্যবস্থার কেন্দ্রেও রয়েছে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ। ঘরবাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার রাখা, খাবার ঢেকে রাখা, ইঁদুর প্রবেশের পথ বন্ধ করা এবং দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা ঘর পরিষ্কার করার সময় সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, যেখানে ইঁদুরের উপস্থিতি বেশি, সেখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সময় মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করা উচিত। একই সঙ্গে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি। কারণ ভাইরাসযুক্ত ধুলাবালি নিশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে ঢুকে পড়ার ঝুঁকি থেকেই সংক্রমণ বেশি হয়।
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তন, নগরায়ণ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের পরিবর্তনের কারণে বন্যপ্রাণী ও মানুষের সংস্পর্শ বাড়ছে। গবেষকেরা মনে করছেন, এসব কারণেও ভবিষ্যতে ইঁদুরবাহিত রোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। ফলে হান্টাভাইরাসকে এখন শুধু একটি বিরল সংক্রমণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বরং এটিকে জনস্বাস্থ্যের জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।





Add comment