ইরানের শান্তিতে নোবেলজয়ী মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদিকে গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতির কারণে তাঁকে সাময়িক জামিন দিয়ে চিকিৎসার সুযোগ দিয়েছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যথাযথ চিকিৎসা না পেলে তাঁর জীবন হুমকির মুখে পড়তে পারে।
নার্গিসের পরিবার পরিচালিত ফাউন্ডেশন রোববার এক বিবৃতিতে জানায়, অসুস্থতার কারণে তাঁকে অস্থায়ীভাবে কারাগারের বাইরে থাকার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। পরে রাজধানী তেহরানের পারস হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এই মানবাধিকারকর্মীকে। বর্তমানে তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা চলছে।
এর আগে গত সপ্তাহে পরিবারের সদস্য ও সমর্থকেরা নার্গিসের স্বাস্থ্যের ভয়াবহ অবনতির কথা তুলে ধরেছিলেন। তাঁদের দাবি, চলতি বছরের শুরুতে কারাগারে অন্তত দুইবার হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন তিনি। কিন্তু প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পাওয়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। পরিবারের আশঙ্কা ছিল, কারাগারে থাকলে সেখানেই তাঁর মৃত্যু হতে পারে।
প্যারিসে অবস্থানরত নার্গিসের স্বামী সপ্তাহান্তে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেন, তাঁর স্ত্রীর সার্বিক পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। তিনি জানান, শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল নয় এবং চিকিৎসকেরা নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন তাঁকে।
নার্গিসের আইনজীবীও তাঁর অবস্থাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছেন। আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগারে থাকার সময় প্রায় ২০ কেজি ওজন কমে গেছে তাঁর। এমনকি স্বাভাবিকভাবে কথা বলতেও কষ্ট হচ্ছে। তাঁকে এখন চেনাটাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বর্তমানে ৫৩ বছর বয়সী এই নোবেলজয়ী গত ১২ ডিসেম্বর থেকে আবারও কারাবন্দী ছিলেন। ইরানের পূর্বাঞ্চলের মাশহাদ শহরে একটি স্মরণসভায় অংশ নেওয়ার পর তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে তাঁর বিরুদ্ধে নতুন সাজা ঘোষণা করা হয়।
আইনজীবীর তথ্য অনুযায়ী, ‘অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে সমবেত হওয়া’ এবং ‘ষড়যন্ত্রে অংশ নেওয়ার’ অভিযোগে তাঁকে ছয় বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এর আগেও তিনি ‘রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রচারমূলক কার্যকলাপ’ এবং ‘রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে যোগসাজশ’-সংক্রান্ত মামলায় দীর্ঘ সাজা ভোগ করছিলেন।
নার্গিস এর আগেও তেহরানের এভিন কারাগারে বন্দী ছিলেন। অসুস্থতার কারণে ২০২৪ সালের শেষ দিকে তাঁকে সাময়িকভাবে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কয়েক মাসের ব্যবধানে আবারও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরেই ইরানে মানবাধিকার লঙ্ঘন, নারী নিপীড়ন এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সরব অবস্থানে ছিলেন নার্গিস। দেশটির নারী অধিকার আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ হিসেবেও তিনি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত। তাঁর কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৩ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় তাঁকে।
নার্গিসের কারাবাস এবং শারীরিক অবস্থার অবনতিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো একাধিকবার তাঁর মুক্তি ও উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। সমর্থকদের মতে, তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভিন্নমত দমনের অংশ।
ইরানের কারাগারগুলোতে বন্দীদের চিকিৎসা সংকট নিয়ে অতীতেও নানা অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক বন্দী ও মানবাধিকারকর্মীদের যথাযথ চিকিৎসা না দেওয়ার অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে। নার্গিসের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি সেই বিতর্ককে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
এদিকে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চিকিৎসকেরা তাঁর শারীরিক অবস্থার ওপর নিবিড় নজর রাখছেন। তবে এখনো পুরোপুরি আশঙ্কামুক্ত নন তিনি।





Add comment