মরুভূমির গরমে উটের টিকে থাকার রহস্য

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ এখন ক্রমেই স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হচ্ছে। বাড়ছে তাপমাত্রা, পাল্টে যাচ্ছে আবহাওয়ার ধরণ। এমন বাস্তবতায় মরুভূমির পরিবেশে বসবাসকারী উট কীভাবে প্রচণ্ড গরমেও স্বাভাবিকভাবে টিকে থাকে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের আগ্রহ ছিল। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা আটলান্টিক ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক এই রহস্য উন্মোচনে নতুন তথ্য সামনে এনেছেন।

গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের তুলনায় উটের কোষ উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে অনেক বেশি কার্যকরভাবে মানিয়ে নিতে পারে। বিশেষ করে কোষীয় পর্যায়ে উটের প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত নমনীয় ও স্থিতিশীল হওয়ায় তারা চরম গরমেও শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়। এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে বিএমসি জিনোমিক্স জার্নালে।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, স্বাভাবিক ও অতিরিক্ত উষ্ণ উভয় পরিবেশেই উটের কোষীয় সুস্থতার মান মানুষের তুলনায় বেশি শক্তিশালী। মানুষের কোষগুলো সাধারণত তাপমাত্রার পরিবর্তনের প্রতি কঠোর ও নিয়ন্ত্রিত প্রতিক্রিয়া দেখায়। ফলে পরিবেশের আকস্মিক পরিবর্তনে তাদের অভিযোজন ক্ষমতা সীমিত হয়ে পড়ে। বিপরীতে উটের কোষগুলো অনেক বেশি নমনীয়ভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় এবং নিজেদের দ্রুত সমন্বয় করতে পারে।

বিজ্ঞানীদের মতে, এই নমনীয়তাই উটকে মরুভূমির মতো প্রতিকূল পরিবেশে দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে সহায়তা করে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানী ফোরবস বলেন, জৈবিক ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা সম্পর্কে এই গবেষণা নতুন ধারণা দিয়েছে। জিনের অভিব্যক্তির পরিবর্তনশীলতা পর্যবেক্ষণ করে বোঝা গেছে, কেন কিছু প্রাণী চরম প্রতিকূল পরিবেশেও স্থির থাকতে পারে, আবার অন্যরা দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে।

প্রকৃতিতে টিকে থাকার জন্য প্রতিটি প্রাণীকেই নিজের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। তাপমাত্রা এই অভিযোজন প্রক্রিয়ার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। সামান্য তাপমাত্রা পরিবর্তনও কোষের ভেতরের জিনগত কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে টিস্যুর সংবেদনশীলতা ও কোষীয় ভারসাম্যও এতে ব্যাহত হতে পারে। এই অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষমতাকেই বিজ্ঞানীরা হোমিওস্ট্যাসিস হিসেবে চিহ্নিত করেন।

গবেষণায় উত্তর আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে পাওয়া এক কুঁজবিশিষ্ট উট এবং মানুষের কোষ নিয়ে তুলনামূলক বিশ্লেষণ চালানো হয়। গবেষকরা মূলত স্কিন ফাইব্রোব্লাস্ট নামের কোষ নিয়ে কাজ করেন। এই কোষ শরীরের টিস্যুর গঠন ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন তাপমাত্রায় উট ও মানুষের জিনগত কার্যক্রমে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, সেটিই ছিল গবেষণার প্রধান লক্ষ্য।

সাধারণত জিনের কার্যক্রম বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে বড় ডেটাসেট ও জটিল পরিসংখ্যানভিত্তিক গবেষণার প্রয়োজন হয়। কিন্তু সীমিত নমুনা ব্যবহার করে সুনির্দিষ্ট ফলাফল পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে গবেষকেরা একটি নতুন বিশ্লেষণ পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন।

তাঁরা শুধু জিনের কার্যক্রমের ওঠানামা পর্যবেক্ষণ করেননি, বরং বিভিন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রে সেই জিনের প্রতিক্রিয়ার ধারাবাহিকতা ও সামঞ্জস্যও বিশ্লেষণ করেছেন। যেসব জিন প্রতিকূল পরিবেশেও স্থিতিশীল থাকে অথবা আরও সমন্বিতভাবে কাজ করে, সেগুলোকে শরীরের ভারসাম্য রক্ষার মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, স্তন্যপায়ী প্রাণীদের তাপ সহনশীলতার ক্ষেত্রে মূলত তিন ধরনের জিনগোষ্ঠী সক্রিয় থাকে। প্রথম গোষ্ঠীর জিনগুলো স্থিতিশীল থেকে পুরো প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। দ্বিতীয় গোষ্ঠীর জিন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সক্রিয় হয় এবং তৃতীয় গোষ্ঠীর জিন বিশৃঙ্খল আচরণ করে, যা শরীরের ওপর বাড়তি চাপের প্রতিফলন হিসেবে কাজ করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গবেষণা শুধু উটের তাপ সহনশীলতা বোঝার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, ভবিষ্যতে মানুষের জন্যও নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যখন বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বাড়ছে, তখন জীববৈচিত্র্য ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব মোকাবিলায় এমন গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed