২০০৬ সালে মুক্তি পাওয়া হলিউড সিনেমা ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা’ ফ্যাশন দুনিয়ার অন্তরালের গল্পকে নতুনভাবে সামনে এনেছিল। সিনেমাটিতে ‘রানওয়ে’ নামের একটি বিখ্যাত ফ্যাশন ম্যাগাজিনের কঠোর ও খিটখিটে প্রধান সম্পাদক এবং তাঁর অধীনে কাজ করা এক তরুণ সহকারীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। মুক্তির পর থেকেই দর্শক ও সমালোচকদের মধ্যে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে, সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র মিরান্ডা প্রিস্টলি কি বাস্তব জীবনের ‘ভোগ’ ম্যাগাজিনের কিংবদন্তি সম্পাদক অ্যানা উইনটোরকে অনুসরণ করেই তৈরি হয়েছিল?
সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে মুক্তি পেয়েছে সিনেমাটির সিক্যুয়েল ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা ২’। প্রায় দুই দশক পর আবারও বড় পর্দায় ফিরেছেন সেই আলোচিত সম্পাদক চরিত্র। নতুন সিনেমার প্রচারণার অংশ হিসেবে ‘ভোগ’ ম্যাগাজিনে এক বিশেষ ফটোশুট ও সাক্ষাৎকারে একসঙ্গে দেখা যায় মেরিল স্ট্রিপ ও উইনটোরকে। তবে এত কিছুর পরও বহু পুরোনো সেই রহস্যের সরাসরি কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
মূল গল্পের শুরু কিন্তু আরও আগে। ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় লরেন ভাইসবার্গারের উপন্যাস ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা’। বইটি প্রকাশের পর থেকেই ফ্যাশন অঙ্গনে গুঞ্জন ওঠে, গল্পটি আসলে ‘ভোগ’ ম্যাগাজিনের অন্দরমহল থেকে নেওয়া। কারণ, লেখক নিজেই একসময় উইনটোরের সহকারী হিসেবে কাজ করেছিলেন।
১৯৯৯ সালে কর্নেল ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা শেষ করার কিছুদিন পর ভাইসবার্গার ‘ভোগ’-এ যোগ দেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল সাংবাদিকতা, ফ্যাশন নয়। এই বাস্তব অভিজ্ঞতাই পরে বইয়ের প্রধান উপাদান হয়ে ওঠে। সিনেমায় যেমন অ্যান্ডি নামের চরিত্রটি ফ্যাশন সম্পর্কে উদাসীন ছিল, বাস্তব জীবনেও লেখকের অবস্থান ছিল প্রায় একই রকম।
বইটির চলচ্চিত্র রূপ মুক্তির পর জনপ্রিয়তা আরও বেড়ে যায়। মিরান্ডা প্রিস্টলি চরিত্রে মেরিল স্ট্রিপের অভিনয় ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায়। পাশাপাশি অ্যান হ্যাথাওয়ে ও এমিলি ব্লান্টের অভিনয়ও দর্শকদের নজর কাড়ে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে মিরান্ডা চরিত্রটি। সাদা চুল, বড় সানগ্লাস, কঠোর অভিব্যক্তি এবং নিখুঁত শৃঙ্খলার প্রতি আবেগ—সবকিছুই যেন ইঙ্গিত করছিল ‘ভোগ’-এর প্রভাবশালী সম্পাদককে।
তবে লেখক সব সময় দাবি করে এসেছেন, মিরান্ডা চরিত্রটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাস্তব জীবনের নির্দিষ্ট কাউকে অনুসরণ করে চরিত্রটি তৈরি করা হয়নি। যদিও পাঠকদের অনেকেই এই ব্যাখ্যায় পুরোপুরি সন্তুষ্ট নন।
এক সাক্ষাৎকারে ভাইসবার্গার বলেছিলেন, বইয়ের সব ঘটনা তাঁর নিজের জীবনের নয়, তবে বাস্তবতা থেকে খুব বেশি দূরেরও নয়। বিশেষ করে বিজ্ঞাপন, পিআর কিংবা ফ্যাশন শিল্পে নতুন ক্যারিয়ার শুরু করা অনেক তরুণ কর্মীর অভিজ্ঞতার সঙ্গে গল্পটির মিল পাওয়া যায়।
অন্যদিকে উইনটোরও বিভিন্ন সময়ে বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেছেন। ২০০৩ সালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ফিকশন তাঁর পছন্দের একটি ধারা, তবে বইটি তিনি পড়বেন কি না, তা নিশ্চিত নন। পরে আরেক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তাঁর সঙ্গে মিরান্ডা চরিত্রের মিল কতটা, সেটি দর্শক ও সহকর্মীরাই ভালো বলতে পারবেন।
তবে নিজের কঠোর ব্যক্তিত্ব নিয়ে তিনি কখনোই অস্বস্তি প্রকাশ করেননি। বরং তিনি বলেছেন, একটি পেশাদার পরিবেশে সেরা ফলাফল পেতে হলে অনেক সময় কঠোর হতে হয়। তাঁর এই বক্তব্য আরও একবার আলোচনাকে উসকে দেয়।
সিনেমার আরেক আলোচিত চরিত্র ছিল এমিলি। এমিলি ব্লান্ট অভিনীত এই চরিত্র নিয়েও দীর্ঘদিন আলোচনা চলে। সম্প্রতি সেলিব্রিটি স্টাইলিস্ট লেসলি ফ্রেমার দাবি করেন, হয়তো তাঁকেই অনুসরণ করে চরিত্রটি লেখা হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় উইনটোর নিজেও তাঁকে এ বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন।
তবে এত আলোচনা, ইঙ্গিত ও গুঞ্জনের পরও এখন পর্যন্ত লেখক সরাসরি কাউকে অনুপ্রেরণা হিসেবে স্বীকার করেননি। কিন্তু ফ্যাশন দুনিয়ার ভেতরের মানুষদের কাছে বিষয়টি অনেকটাই পরিষ্কার। তাঁদের মতে, মিরান্ডা প্রিস্টলির মধ্যে বাস্তবের উইনটোরের ছায়া স্পষ্টভাবেই উপস্থিত।
দুই দশক পেরিয়ে গেলেও ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা’ কেবল একটি সিনেমা নয়, বরং ফ্যাশন জগতের ক্ষমতা, চাপ ও পেশাদার জীবনের প্রতীক হয়ে রয়েছে। আর সেই সঙ্গে বেঁচে আছে একটি প্রশ্নও—মিরান্ডা কি শুধুই কাল্পনিক, নাকি বাস্তবের একজন কিংবদন্তি সম্পাদকের প্রতিচ্ছবি?





Add comment