হরমুজ সংকটে কাঁপছে পেট্রোডলার ব্যবস্থা

একসময় বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম স্থিতিশীল কাঠামো হিসেবে বিবেচিত হতো পেট্রোডলার ব্যবস্থা। উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল রপ্তানি হতো, আর সেই তেলের বিনিময়ে অর্জিত ডলার আবার ফিরে যেত যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে। ১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে গড়ে ওঠা এই ব্যবস্থাই ডলারকে বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তেল, ডলার ও মার্কিন ট্রেজারি বন্ডকে ঘিরে তৈরি হয় বহুল আলোচিত ‘পেট্রোডলার’ কাঠামো।

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে এই ব্যবস্থার আধিপত্য প্রায় অটুট ছিল। তেলের মূল্য নির্ধারণ, লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের বড় অংশই পরিচালিত হয়েছে ডলারে। তবে সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও বিকল্প মুদ্রার ব্যবহার বাড়ার ফলে সেই পুরোনো কাঠামোতে ফাটল দেখা যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

বিশেষ করে গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি ও আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় পরীক্ষাক্ষেত্রে পরিণত হয়। মার্চের শুরুতে ইরান হরমুজ প্রণালিতে আংশিক নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দিতে শুরু করে।

জানা যায়, যেসব দেশকে ইরান ‘অশত্রু’ হিসেবে বিবেচনা করেছে, তাদের জাহাজকে নিরাপত্তাসহ চলাচলের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এর জন্য প্রতি যাত্রায় প্রায় ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ট্রানজিট ফি আদায় করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অর্থের একটি অংশ ডলারের পরিবর্তে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে পরিশোধ করা হয়েছে। এই অর্থ সংগ্রহ করেছে ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কর্পস।

পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরও পরিবর্তিত হয়। মার্চের শেষ নাগাদ দেখা যায়, হরমুজ প্রণালি ব্যবহারকারী কিছু জাহাজ ইউয়ান বা ডিজিটাল মুদ্রায় অর্থ পরিশোধ করে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। একই সময়ে রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রেও এশিয়ার অনেক পরিশোধনাগার বিকল্প মুদ্রা ব্যবহার শুরু করে, যা ডি-ডলারাইজেশন প্রবণতাকে আরও দৃশ্যমান করে তোলে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, এর ফলে বৈশ্বিক তেলবাজারে ধীরে ধীরে দুই ধরনের ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। একদিকে রয়েছে ডলারনির্ভর প্রচলিত বাজার, অন্যদিকে বিকল্প মুদ্রাভিত্তিক সমান্তরাল বাজার। সরবরাহ, মূল্য নির্ধারণ এবং পরিবহন ব্যবস্থায় ভূরাজনৈতিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

জিওপলিটিক্যাল বিজনেস ইনকের প্রতিষ্ঠাতা প্রকাশ অ্যারাবিয়ান বিজনেসকে বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোয় কার্যত বিভাজন তৈরি হচ্ছে। তাঁর মতে, ডি-ডলারাইজেশন এখন আর শুধু ধারণা নয়, বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে। তেল পরিবহন, মূল্য নির্ধারণ এবং লেনদেনের ক্ষেত্রে ডলারের বাধ্যতামূলক অবস্থান দুর্বল হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রিকস জোটও এই পরিবর্তনের ফলে নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিকস সদস্য দেশগুলো হরমুজ প্রণালিতে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছে, যা জোটের বাইরের দেশগুলোর জন্য সহজলভ্য নয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে রাজনৈতিক জোট এখন সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব ফেলছে।

এদিকে তেলবাজারে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে বলেও মনে করছেন অর্থনীতিবিদেরা। নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা তেল ডলার ছাড়া অন্য মুদ্রায় বিক্রি হচ্ছে। একই সঙ্গে বিকল্প অর্থপ্রদানের অবকাঠামোও তৈরি হচ্ছে, যা ধীরে ধীরে মার্কিনকেন্দ্রিক ব্যবস্থার বাইরে একটি নতুন আর্থিক পরিবেশ গড়ে তুলছে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ডলার তার শক্তি হারিয়েছে। বরং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও সংঘাতের কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে ডলারের চাহিদা এখনো অনেক বেশি। বিনিয়োগকারীরা মার্কিন ট্রেজারি বন্ড ও ডলারভিত্তিক সম্পদের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের অবস্থান এখনো শক্তিশালী রয়েছে।

তবুও বিকল্প মুদ্রায় প্রতিটি নতুন লেনদেন এবং ডলারবহির্ভূত প্রতিটি চুক্তি বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় নতুন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, পরিবর্তন রাতারাতি না এলেও দীর্ঘমেয়াদে পেট্রোডলার ব্যবস্থার প্রভাব কমতে পারে।

এরই মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপেক ছাড়ার ঘোষণাও নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। যদিও এর সরাসরি প্রভাব পেট্রোডলারের ওপর তাৎক্ষণিক নয়, তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ইঙ্গিত হিসেবে এটিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এখনো ডলারকেন্দ্রিক। কিন্তু আগের মতো একক কাঠামো আর নেই। তেলের দাম নির্ধারণ, লেনদেন এবং পরিবহন পদ্ধতিতে বৈচিত্র্য বাড়ছে। ফলে পেট্রোডলার ব্যবস্থা এখনো টিকে থাকলেও তার আগের সেই অটুট স্থিতিশীলতা আর দেখা যাচ্ছে না।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed