কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআইকে ঘিরে ইলন মাস্ক ও প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান নেতৃত্বের মধ্যে চলমান আইনি লড়াই নতুন মোড় নিয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার একটি ফেডারেল আদালতে চলমান মামলায় ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে দাবি করেছেন, মঙ্গল গ্রহে বসতি স্থাপনের পরিকল্পনার জন্য বিপুল অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যেই মাস্ক কোম্পানিটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চাইতেন।
মঙ্গলবার আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে ওপেনএআইয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট জানান, ২০১৭ সালে মাস্ক ওপেনএআইকে অলাভজনক প্রতিষ্ঠান থেকে লাভজনক কাঠামোয় রূপান্তরের পক্ষে ছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল, উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি তৈরিতে যে পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন, তা অলাভজনক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব নয়।
বর্তমানে এই মামলাকে প্রযুক্তি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনি লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, এর ফলাফল ওপেনএআইয়ের ভবিষ্যৎ কাঠামো এবং নেতৃত্বে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
২০২২ সালের শেষ দিকে চ্যাটজিপিটি চালুর পর বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ওপেনএআই দ্রুত বিশ্বের অন্যতম আলোচিত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট বলেন, শুধু ২০২৬ সালেই কম্পিউটিং রিসোর্সের জন্য প্রায় পাঁচ হাজার কোটি ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
মাস্কের অভিযোগ, তাঁকে অলাভজনক উদ্যোগ হিসেবে ওপেনএআইয়ে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার বিনিয়োগে রাজি করানো হয়েছিল। কিন্তু পরে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্ব দাতব্য উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে এটিকে মুনাফাকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করেছে। এ কারণে তিনি এখন ১৫ হাজার কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন এবং বর্তমান প্রধান নির্বাহী ও প্রেসিডেন্টকে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়ার আবেদন জানিয়েছেন।
মাস্ক ২০১৮ সালে ওপেনএআইয়ের বোর্ড ছাড়েন। তবে আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে উঠে এসেছে, বোর্ড ছাড়ার আগেই তিনি প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বড় ধরনের পরিকল্পনা করেছিলেন। প্রেসিডেন্টের ভাষ্যমতে, মাস্ক স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে তিনি ওপেনএআইয়ের নেতৃত্বে আসতে চান এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা নিজের হাতে রাখতে আগ্রহী।
তিনি আদালতে একটি বৈঠকের বর্ণনা দেন, যেখানে মাস্ক নাকি বলেছিলেন, তাঁর ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতার কারণেই তিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ মালিকানা পাওয়ার যোগ্য। ওই মালিকানার মাধ্যমে তিনি মঙ্গল গ্রহে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শহর গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।
সাক্ষ্যে আরও দাবি করা হয়, মাস্ক বলেছিলেন মঙ্গল প্রকল্প বাস্তবায়নে তাঁর আট হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন। সেই কারণেই তিনি ওপেনএআইয়ের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে চেয়েছিলেন এবং কখন সেই নিয়ন্ত্রণ ছাড়বেন, সেটিও নিজেই নির্ধারণ করতে চেয়েছিলেন।
ওই বৈঠকের শুরুটা ইতিবাচক ছিল বলেও আদালতে জানানো হয়। কয়েক দিন আগেই মাস্ক ওপেনএআইয়ের কিছু কর্মীকে তাঁদের কাজের স্বীকৃতি হিসেবে টেসলা উপহার দিয়েছিলেন। সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য মাস্ককে একটি বিশেষ চিত্রকর্মও উপহার দিতে চেয়েছিলেন।
তবে সম্ভাব্য শেয়ার কাঠামো নিয়ে আলোচনা শুরু হলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। প্রেসিডেন্টের দাবি, প্রস্তাবিত কাঠামো পছন্দ না হওয়ায় মাস্ক ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং সরাসরি তা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি এত দ্রুত এগিয়ে আসেন যে উপস্থিতদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল বলেও আদালতে উল্লেখ করা হয়। পরে তিনি সেই চিত্রকর্ম নিয়ে বৈঠককক্ষ ত্যাগ করেন এবং জানান, বিষয়গুলোর সমাধান না হওয়া পর্যন্ত নতুন অর্থায়ন বন্ধ রাখবেন।
মামলার শুনানিতে মাস্কের আইনজীবীরা ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্টকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন, যিনি ব্যক্তিগত আর্থিক লাভকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আগের দিনের সাক্ষ্যে তিনি জানিয়েছিলেন, ওপেনএআইয়ে তাঁর শেয়ারের মূল্য প্রায় তিন হাজার কোটি ডলার। এছাড়া আরও দুটি স্টার্টআপে তাঁর অংশীদারিত্ব রয়েছে এবং প্রধান নির্বাহীর পারিবারিক তহবিলেও তাঁর শেয়ার আছে।
আদালতে উপস্থাপিত একটি ডায়েরির অংশেও আর্থিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয়টি উঠে আসে। সেখানে তিনি লিখেছিলেন, কোন উদ্যোগ তাঁকে একশ কোটি ডলারের মালিক করতে পারে, তা নিয়ে ভাবছিলেন।
২০১৯ সালের আগে ওপেনএআই সম্পূর্ণ অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হতো। পরে এটি একটি মুনাফাভিত্তিক ইউনিটসহ নতুন কাঠামোয় পুনর্গঠিত হয়। এরপর গবেষক নিয়োগ, কম্পিউটিং অবকাঠামো এবং সম্প্রসারণের জন্য প্রায় ১০ হাজার কোটি ডলার সংগ্রহ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ বছর ওপেনএআই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলে এর মূল্য প্রায় এক লাখ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে ওপেনএআই কর্তৃপক্ষের দাবি, কোম্পানির সাফল্যের আগেই বোর্ড ছেড়ে যাওয়ার কারণে মাস্ক এখন নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে চাইছেন। একই সঙ্গে নিজের এআই কোম্পানি এক্সএআইকে আরও শক্তিশালী করতেও এই মামলা করা হয়ে থাকতে পারে।
এদিকে এক্সএআই ইতোমধ্যে স্পেসএক্সের সঙ্গে একীভূত হয়েছে এবং স্পেসএক্সও চলতি বছর পুঁজিবাজারে আসতে পারে। বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, সে ক্ষেত্রে তাদের আইপিও ওপেনএআইয়ের তুলনায় আরও বড় হতে পারে।





Add comment