প্রতিবছরের মতো এবারও মে মাসের প্রথম সোমবার নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব আর্টে বসেছে বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন আসর মেট গালা। বাংলাদেশ সময় সকাল থেকেই সামাজিক মাধ্যমে দেখা গেছে এর ঝলক। এবারের থিম ছিল ‘ফ্যাশন ইজ আর্ট’, যেখানে তারকাদের পোশাকে শিল্পকর্মের প্রতিফলন থাকার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। মানবদেহের গঠন থেকে শুরু করে বোল্ড সিলুয়েট—বিভিন্ন ধরণের শিল্পধারা উঠে এসেছে অংশগ্রহণকারীদের সাজে। এই আয়োজনের মঞ্চে ভারতীয় তারকারাও নিজেদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ছাপ তুলে ধরেছেন।
প্রথমবারের মতো এই আয়োজনে অংশ নেন এক বলিউড পরিচালক। তাঁর পরনে ছিল খ্যাতনামা ডিজাইনারের তৈরি একটি বিশেষ পোশাক, যা চিত্রশিল্পীর কাজ থেকে অনুপ্রাণিত। নিজেই সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন, ওই শিল্পীর কাজ তাঁর কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। হাতে আঁকা নকশা, জারদৌজি কাজ এবং পদ্ম, রাজহাঁস ও স্তম্ভের ডিজাইনে সাজানো এই পোশাকটি তৈরি করতে সময় লেগেছে ৮৬ দিন এবং ৫ হাজার ৬০০ ঘণ্টার বেশি শ্রম।
এক উদ্যোক্তাও লাল গালিচায় নজর কাড়েন তাঁর ভিন্নধর্মী স্টাইলের জন্য। স্ট্রাকচার্ড কালো কতুর পোশাকে তাঁকে দেখা যায়, যার সঙ্গে যুক্ত ছিল এক শিল্পীর তৈরি ধাতব মুখোশ। পুরো লুকটি ছিল পরীক্ষামূলক এবং আধুনিক শিল্পের একটি প্রতিফলন।
রাজপরিবারের প্রতিনিধিরাও ছিলেন এই আয়োজনে। একজন বেছে নেন তাঁর দাদির পুরোনো শিফন শাড়ি, যা আধুনিক রূপে গাউন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অন্যজন ঐতিহ্যবাহী সিলুয়েটের সঙ্গে ভেলভেট কোট পরে উপস্থিত হন। এই যুগল উপস্থিতি ঐতিহ্য ও আধুনিকতার এক মেলবন্ধন তৈরি করে।
এক বিলিয়নিয়ার সমাজসেবীও নজর কাড়েন তাঁর পোশাকের মাধ্যমে। তাঁর পরা পোশাকটি ‘ট্রি অব লাইফ’ ধারণা থেকে অনুপ্রাণিত, যা দক্ষিণ ভারতের ঐতিহ্যবাহী শিল্পধারার প্রতিফলন। ৯০ জনের বেশি কারিগরের ৩ হাজার ৪৫৯ ঘণ্টার শ্রমে তৈরি এই পোশাকে পাখি, গাছ, ফুল, সূর্য ও চাঁদের নকশা ফুটে উঠেছে। ভেলভেট, সিল্ক ও টুল কাপড়ের ব্যবহারে তৈরি এই গাঢ় নীল পোশাকটি ছিল সোনালি সূচিকর্মে সমৃদ্ধ। নিজের সংগ্রহের গয়নায় তিনি সাজ সম্পূর্ণ করেন।
এই আয়োজনের আরেক আকর্ষণ ছিলেন খ্যাতিমান এক ডিজাইনার, যিনি নিজেই নিজের তৈরি পোশাক পরে উপস্থিত হন। তাঁর লুকে ছিল ভারতীয় কারুশিল্পের ছাপ এবং বিশেষভাবে তুলে ধরা হয় সেই কারিগরদের, যাঁরা এসব পোশাক তৈরি করেন। তাঁর পোশাকে কারিগরদের নাম ও স্বাক্ষর যুক্ত ছিল, যা ফ্যাশনকে একটি সম্মিলিত শিল্পচর্চা হিসেবে তুলে ধরে।
তবে সব আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন এক ভারতীয় ব্যবসায়ী। তিনি লাল গালিচায় হাজির হন শাড়ি এবং ভাস্কর্যের আদলে তৈরি কেপ পরে। খাঁটি সোনার সুতো দিয়ে বোনা এই শাড়িতে প্রাচীন ভারতীয় চিত্রকলার প্রভাব স্পষ্ট ছিল। পাড়জুড়ে হাতে আঁকা নকশা, জারদৌজি, আরি কাজ এবং রিলিফ এমব্রয়ডারির সমন্বয় দেখা গেছে এতে। ৫০ জনের বেশি কারিগরের ১ হাজার ২০০ ঘণ্টার শ্রমে তৈরি এই পোশাকটি ছিল নিখুঁত কারুশিল্পের উদাহরণ।
তাঁর ব্লাউজে ব্যবহৃত হয়েছে পারিবারিক গয়নার সংগ্রহ, যেখানে ২০০টির বেশি পুরোনো কাটের হীরা হাতে সেলাই করে বসানো হয়েছে। গলায় ছিল দুই স্তরের হীরার নেকলেস, যার মোট ওজন ২৫০ ক্যারেটের বেশি। হাতের অলংকার ও কোমরের গয়নায়ও ছিল হীরার ঝলক। লুকটি সম্পূর্ণ করতে ব্যবহার করা হয় জুঁই ফুল অনুপ্রাণিত হেয়ার স্কাল্পচার, যা কাগজ, তামা ও পিতল দিয়ে তৈরি।
অন্য এক সমাজসেবী ও ব্যবসায়ী উপস্থিত হন ভিন্নধর্মী লুকে। তাঁর পোশাকের সঙ্গে যুক্ত ছিল ভাস্কর্যধর্মী একটি আর্ট পিস, যা বুকজুড়ে পরা ছিল। সাদা রেজিন দিয়ে তৈরি এই নকশা সামনের ও পেছনের দিকে ছড়িয়ে গিয়ে একধরনের বর্মের অনুভূতি সৃষ্টি করেছিল। এর সঙ্গে সাদা গাউন এবং ন্যূনতম মেকআপ তাঁর লুককে পরিপূর্ণ করে তোলে।
সব মিলিয়ে এবারের মেট গালায় ভারতীয় তারকারা শুধু ফ্যাশনের ঝলকই দেখাননি, বরং শিল্প, ঐতিহ্য এবং কারুশিল্পের এক অনন্য উপস্থাপনাও তুলে ধরেছেন। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সেই ব্যবসায়ীর বিলাসবহুল ও নিখুঁত কারুকাজে তৈরি পোশাক, যা অনেকের কাছেই এই আয়োজনের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী এবং সম্ভাব্যভাবে সবচেয়ে দামী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।





Add comment