যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হেফাজতে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ১৪ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে, যা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ এক মেক্সিকান নাগরিক ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসের বাইরে অবস্থিত একটি আটক কেন্দ্রে অচেতন অবস্থায় পাওয়ার পর মারা যান।
ফেডারেল তথ্য বলছে, ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার অধীনে ৬৮ হাজারের বেশি অভিবাসী আটক ছিলেন, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ সংখ্যা। যদিও এই সংখ্যা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, কারণ একদিকে যেমন কিছু অভিবাসীকে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়, অন্যদিকে নতুন করে অনেককে আটক করা হয়।
গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে এ ধরনের হেফাজতে মোট ৩৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল, আর ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ১১। চলতি বছরের শুরুর দিকেই মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ায় বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
বৃহৎ পরিসরে অভিবাসী আটক ও বহিষ্কার কার্যক্রম জোরদারের অংশ হিসেবে আটক কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এ ধরনের উদ্যোগের ফলে অনেক কেন্দ্রেই অতিরিক্ত ভিড় এবং রোগব্যাধির বিস্তার দেখা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
টেক্সাসের এল পাসোর বাইরে ফোর্ট ব্লিসে অবস্থিত সবচেয়ে বড় অভিবাসী আটক কেন্দ্রে সম্প্রতি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন করা হয়েছে, যা চালু হওয়ার মাত্র সাত মাসের মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ক্যাম্প ইস্ট মন্টানা নামে পরিচিত এই কেন্দ্রটি শুরু থেকেই নানা সমস্যায় জর্জরিত ছিল। নির্মাণকাজ চলাকালে এক শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনা ছাড়াও স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনজন আটক ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে, যার একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এছাড়া সেখানে যক্ষ্মা ও হাম রোগের প্রাদুর্ভাবের ঘটনাও সামনে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন জানিয়েছে, তাদের বহিষ্কার কৌশলে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। এখন বিশেষভাবে এমন অভিবাসীদের আটক ও বহিষ্কারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যাদের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক রেকর্ড রয়েছে। এই নীতিগত পরিবর্তনের পেছনে মিনেসোটায় বহিষ্কার অভিযানের সময় দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনাও ভূমিকা রেখেছে বলে জানা গেছে।
গত ২৫ মার্চ ক্যালিফোর্নিয়ায় ফেডারেল হেফাজতে থাকা এক মেক্সিকান নাগরিককে তাঁর শয্যায় অচেতন অবস্থায় দেখতে পান নিরাপত্তাকর্মীরা। পরবর্তীতে কর্তৃপক্ষ জানায়, তাঁকে দ্রুত চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হয় এবং জীবনরক্ষাকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। পরে তাঁকে ভিক্টর ভ্যালি গ্লোবাল মেডিকেল সেন্টারে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, এই মৃত্যুর প্রতিবাদে তাদের সরকার আরও জোরালো পদক্ষেপ নেবে, বিশেষ করে লস অ্যাঞ্জেলেস অঞ্চলে এ বিষয়ে কার্যক্রম বাড়ানো হবে।
উক্ত ব্যক্তিকে ফেব্রুয়ারির ২৩ তারিখে আটক করা হয়েছিল এবং একটি আটক কেন্দ্রে পাঠানো হয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তাঁর ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরলের সমস্যা শনাক্ত করা হয়। কর্তৃপক্ষের দাবি, হেফাজতে থাকার সময় তিনি নিয়মিত চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পেয়েছিলেন।
তবে তাঁর মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের পক্ষ থেকেও কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
লস অ্যাঞ্জেলেসে মেক্সিকান কনস্যুলেটে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নিহত ব্যক্তির পরিবারের সদস্যরা কান্নাজড়িত কণ্ঠে ঘটনার প্রতিবাদ জানান এবং প্রকৃত সত্য জানার দাবি করেন। তাঁর কন্যা অভিযোগ করেন, তাঁর বাবার সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে এবং পরিবারের সদস্য হিসেবে তারা প্রকৃত ঘটনা জানার অধিকার রাখেন।
নিহতের পুত্রও আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, তাঁর বাবা একজন পরিশ্রমী ও ভালো মানুষ ছিলেন এবং তাকে অপরাধী হিসেবে দেখাটা অন্যায়।
মেক্সিকোর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরে ইতোমধ্যে চারজন মেক্সিকান নাগরিক এ ধরনের হেফাজতে মারা গেছেন, যাদের মৃত্যুর পেছনে চিকিৎসাজনিত জটিলতা থাকার কথা বলা হচ্ছে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, এই ঘটনাগুলো একটি দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয় এবং এ ধরনের মৃত্যুর পুনরাবৃত্তি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।





Add comment