মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব এবার পড়েছে আন্তর্জাতিক ব্যবহৃত গাড়ির বাজারে। ইরানকে ঘিরে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার জেরে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার পুরোনো গাড়ি রপ্তানিকারকেরা পড়েছেন কঠিন পরিস্থিতিতে। জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় অনেক ব্যবসায়ীই নির্ধারিত সময়ে গাড়ি নামাতে পারছেন না, ফলে ব্যবসায় মন্দা দেখা দিয়েছে।
জাপানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী এক উদ্যোক্তার পরিচালিত প্রতিষ্ঠান কোবে মোটর দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ব্যবহৃত জাপানি গাড়ি সরবরাহ করে থাকে। উন্নত মান এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে জাপানি ব্যবহৃত গাড়ি বিশ্ববাজারে দীর্ঘদিন ধরেই জনপ্রিয়। ক্রেতারা এগুলোকে নিরাপদ ও টেকসই হিসেবে বিবেচনা করেন।
তবে সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। এতে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এই খাতের ব্যবসায়ীরা। সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি জানতে পারেন, তার ৫০০টিরও বেশি গাড়ি সমুদ্রে আটকা পড়েছে। নির্ধারিত সময়েও জাহাজ শ্রীলঙ্কার বন্দরে প্রবেশ করতে পারেনি। কারণ হিসেবে বলা হয়, দুবাই থেকে আসা অতিরিক্ত কার্গোর কারণে বন্দরে জায়গা সংকট তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও জানান, দীর্ঘ অপেক্ষার পর গাড়িগুলো অবশেষে হম্বানটোটা বন্দরে নামানো সম্ভব হলেও এতে ১০ দিনের বেশি সময় বিলম্ব হয়েছে। এই ধরনের দেরি ব্যবসার উপর বড় ধরনের চাপ তৈরি করছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালির আংশিক অচলাবস্থা শুধু জাপান বা দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যবসায়ীদের জন্য নয়, বরং বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত গাড়ির বাজারের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই শিল্পটি আকারে ছোট মনে হলেও এর সরবরাহব্যবস্থা বিস্তৃত এবং বহু দেশের অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত।
বন্দর জটের কারণে শিপিং কোম্পানিগুলোর মধ্যেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে চালান বাতিল করেছে, আবার কেউ কেউ পাকিস্তান বা চীনের বন্দরে পণ্য পাঠানোর প্রস্তাব দিচ্ছে। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে গাড়িপ্রতি ৫ হাজার ডলার পর্যন্ত অতিরিক্ত আমানত চাওয়া হচ্ছে। ফলে অনেক চালান জাপানে ফেরত পাঠানোর সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে।
উল্লেখ্য, কোবে মোটর প্রতি বছর প্রায় ১৮ হাজার গাড়ি রপ্তানি করে থাকে, যার বড় অংশ শ্রীলঙ্কায় যায়। বর্তমানে প্রায় ৫০টি বিলাসবহুল ব্যবহৃত গাড়ি বিভিন্ন বন্দরে আটকে রয়েছে, যার মধ্যে রোলস-রয়েস, ল্যাম্বারগিনি ও ফেরারির মতো ব্র্যান্ড রয়েছে। এসব গাড়ি বহনকারী জাহাজগুলো দুবাই পৌঁছাতে পারছে না। বিকল্প হিসেবে বিমানপথে পাঠানো সম্ভব হলেও এতে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়, যা সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মিলিয়ে গত বছর প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারের ব্যবহৃত গাড়ি রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রপ্তানি গেছে মধ্যপ্রাচ্যে। জাপানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাজার ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত, যেখানে ২ লাখ ২৪ হাজার ইউনিট গাড়ি পাঠানো হয়েছে।
চলতি মৌসুমে দক্ষিণ কোরিয়াতেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাধারণত এই সময়টিতে গাড়ির চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু বর্তমানে চালান কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। ইঞ্চিয়ন বন্দরের একটি সংরক্ষণ কমপ্লেক্সে গাড়ির সংখ্যা বাড়লেও পরিবহন কমে গেছে।
শিপিং খাতের এক কর্মকর্তা জানান, সাধারণত তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ গাড়ি মধ্যপ্রাচ্যে যায়। বর্তমানে ৭০ শতাংশের বেশি গাড়ি গুদামে আটকে আছে। সমুদ্রে থাকা অনেক জাহাজ বিকল্প পথ অনুসরণ করছে বা যাত্রা স্থগিত করেছে।
কিছু জাহাজ হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে অন্য বন্দরে পণ্য নামানোর পরিকল্পনা করছে। তবে এটি সম্পূর্ণভাবে শিপিং লাইনের সিদ্ধান্ত এবং পরিবেশকেরা এখনো বিকল্প সমাধান খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
একজন পরিবেশক প্রতিষ্ঠানের প্রধান বলেন, যুদ্ধ শুরু হলে তাদের হাতে মূলত দুটি পথই খোলা থাকে—অপেক্ষা করা এবং গাড়িগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ চালিয়ে যাওয়া। ইতোমধ্যে সংরক্ষণ খরচ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান আগাম গাড়ি কিনে রাখার পরিকল্পনা করছে, আশায় যে সংঘাত শেষ হলে বাজার আবার স্বাভাবিক হবে।
অন্যদিকে কিছু রপ্তানিকারক বিকল্প বাজার খোঁজার চেষ্টা করলেও আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকায় অতিরিক্ত চাহিদা না থাকায় সেখানেও বড় সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। ফলে সমুদ্রে আটকে থাকা কার্গোর গন্তব্য অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে এবং ব্যবসায়ীরা কার্যত দিশেহারা অবস্থায় রয়েছেন।





Add comment