মঙ্গল গ্রহে পারমাণবিক শক্তিচালিত মহাকাশযান পাঠানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা। দীর্ঘদিন ধরে মঙ্গল অভিযানে রাসায়নিক জ্বালানি ও সৌরশক্তির ওপর নির্ভরশীলতা থাকলেও নতুন এই উদ্যোগের মাধ্যমে মহাকাশ ভ্রমণে গতি ও সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সবকিছু অনুকূলে থাকলে ২০২৮ সালের মধ্যেই এই মহাকাশযান মঙ্গলের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করতে পারে।
সংস্থার তথ্যমতে, এই মিশনের অন্যতম লক্ষ্য হলো মহাকাশ ভ্রমণকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করা। একই সঙ্গে সৌরশক্তির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে সূর্যের আলো না থাকলেও মহাকাশযান সচল রাখার সক্ষমতা অর্জন করা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তি ভবিষ্যতে ভিনগ্রহে মানুষের বসতি স্থাপনের পথকে আরও সুগম করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
এই মিশনের মূল ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হবে নিউক্লিয়ার ইলেকট্রিক প্রপালশন প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে একটি ছোট পারমাণবিক চুল্লি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে, যা মহাকাশযানকে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রমে সহায়তা করবে। এ প্রযুক্তি প্রচলিত ব্যবস্থার তুলনায় বেশি কার্যকর এবং দীর্ঘমেয়াদি মিশনের জন্য উপযোগী বলে বিবেচিত হচ্ছে।
মঙ্গল গ্রহে পৌঁছানোর পর মহাকাশযানটিতে থাকা ‘স্কাইফল’ নামের একটি ড্রোন হেলিকপ্টার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করবে। এই হেলিকপ্টারগুলো এমন সব দুর্গম অঞ্চলে পৌঁছাতে সক্ষম হবে, যেখানে প্রচলিত রোবট বা যানবাহনের পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়। ফলে মঙ্গলের ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।
প্রথাগত মহাকাশযান সাধারণত রাসায়নিক জ্বালানির ওপর নির্ভর করে, যা সীমিত শক্তি সরবরাহ করে এবং দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে নানা সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। এর বিপরীতে পারমাণবিক শক্তি একটি স্থিতিশীল ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। ফলে মহাকাশযান দীর্ঘ সময় ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়।
বর্তমানে সংস্থাটি দুটি প্রধান প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে। এর একটি হলো নিউক্লিয়ার থার্মাল প্রপালশন, যেখানে পারমাণবিক চুল্লির সাহায্যে হাইড্রোজেনজাতীয় প্রপেল্যান্টকে উত্তপ্ত করে শক্তি উৎপাদন করা হয়, যা মহাকাশযানকে সামনে এগিয়ে নিতে সহায়তা করে। অন্যটি হলো নিউক্লিয়ার ইলেকট্রিক প্রপালশন, যেখানে পারমাণবিক শক্তি থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ ব্যবহার করে আয়ন ইঞ্জিন চালানো হয়। এই প্রযুক্তিগুলোর সমন্বয়ে মহাকাশ ভ্রমণকে আরও দক্ষ ও নির্ভরযোগ্য করার চেষ্টা চলছে।
বর্তমান প্রযুক্তিতে পৃথিবী থেকে মঙ্গল গ্রহে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় ৬ থেকে ৯ মাস। এই দীর্ঘ যাত্রা মহাকাশচারীদের জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। পারমাণবিক শক্তিচালিত মহাকাশযান এই সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ফলে মহাকাশচারীদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকিও কমে আসবে।
সংস্থার এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগ মানুষের মঙ্গল অভিযানে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হবে। সূর্য থেকে দূরে অবস্থান করলেও বিদ্যুৎ উৎপাদনে কোনো সমস্যা হবে না, যা দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ অভিযানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া ধুলাঝড়ের মতো প্রতিকূল পরিবেশেও এই প্রযুক্তি কার্যকরভাবে কাজ করতে পারবে।
সব মিলিয়ে, পারমাণবিক শক্তিচালিত মহাকাশযান মিশনটি ভবিষ্যতের মহাকাশ গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। এটি শুধু মঙ্গল অভিযানের ক্ষেত্রেই নয়, বরং আরও দূরবর্তী গ্রহে মানুষের উপস্থিতি নিশ্চিত করার পথেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।





Add comment