গত ১ আগস্ট সিঙ্গাপুরের নানইয়াং টেকনোলজিক্যাল ইউনিভার্সিটির সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন টিকটকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তাঁর বক্তব্যের নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হলো।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি সিঙ্গাপুরে কাটানো নিজের শৈশবের কথা স্মরণ করেন এবং সেই অনিশ্চিত যাত্রার প্রসঙ্গ তোলেন, যা তাঁকে আজকের এই মঞ্চে পৌঁছে দিয়েছে। তাঁর ভাষায়, ফিরে তাকালে বোঝা যায় শিক্ষা আসলে এমন এক পাসপোর্ট, যার কোনো মেয়াদ থাকে না এবং শিক্ষাই একজন মানুষের পৃথিবীর সীমানা বারবার নতুন করে গড়ে দেয়।
আশির দশকে সিঙ্গাপুরের ইউকাং এলাকায় জন্ম নেওয়া টিকটকপ্রধান বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি নিজের এলাকার বাইরে খুব বেশি কিছু ভাবতে পারতেন না। নিজের পাড়া, দৈনন্দিন অভ্যস্ত জীবনযাত্রা আর পরিচিত পরিবেশই ছিল তাঁর জগতের সীমানা। তবে একপর্যায়ে দেশের অন্য প্রান্তে গিয়ে পড়াশোনার সুযোগ পান তিনি। ইউকাং থেকে বুকিত তিমাহর দূরত্ব খুব বেশি না হলেও, ছোটবেলার সেই ছেলেটির জন্য তা ছিল অনেকখানি এক পথ, যা তাঁকে নিজের চেনা গণ্ডির বাইরে বের করে আনে।
তিনি এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে গোটা সিঙ্গাপুরের গল্পের সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর মতে, ভৌগোলিক দিক থেকে সিঙ্গাপুর একটি ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্র হলেও কৌতূহল ও প্রতিকূলতা জয়ের সক্ষমতার কারণেই দেশটি বৈশ্বিক পর্যায়ে বিশাল প্রভাব তৈরি করতে পেরেছে। স্নাতকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এখন তাঁদেরও নিজেদের প্রভাব বিস্তারের সময়, কারণ গভীর একাডেমিক জ্ঞান, প্রবল আবেগ ও প্রচলিত ধারাকে প্রশ্ন করার সাহস নিয়েই তাঁরা স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
নিজের ক্যারিয়ারের কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, তিনি হয়তো অন্যদের মতো একই পথে হাঁটেননি, তবে সারা ক্যারিয়ারজুড়েই নিজের কৌতূহলকে অনুসরণ করেছেন। শৈশব থেকেই তাঁর বিশ্বাস ছিল, সবাই যা প্রত্যাশা করে তার চেয়ে ভিন্ন কিছু করার মধ্য দিয়েই প্রকৃত প্রভাব তৈরি করা সম্ভব। শৈশবে বাবার কেনা একটি পুরোনো মডেলের ব্যক্তিগত কম্পিউটারের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটানোর স্মৃতিচারণ করে তিনি রসিকতা করে বলেন, তিনি তখন মূলত গেম খেলতেন, কোনো বড় সফটওয়্যার তৈরি করেননি। তবে সেই সময়টুকুই প্রযুক্তির প্রতি তাঁর ভালোবাসার ভিত গড়ে দিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে তিনি লন্ডনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন এবং এরপর একটি বহুজাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে এমবিএ করতে ভর্তি হন হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলে। বৈশ্বিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ কোন দিকে এগোচ্ছে, তা জানার আগ্রহ থেকেই তিনি এই পথ বেছে নিয়েছিলেন। সে সময় উদ্ভাবনী প্রযুক্তি স্টার্টআপগুলোতে বিপুল বিনিয়োগ আসতে শুরু করে, আর চোখের সামনে ঘটতে থাকা এই পরিবর্তন তাঁর কাছে ছিল দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেওয়ার মতো এক অভিজ্ঞতা।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তির প্রতি তাঁর শৈশবের সেই সুপ্ত আগ্রহ আবার জেগে ওঠে। তিনি বলেন, প্রকৃত কৌতূহলের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এর ভিত্তি অত্যন্ত মজবুত, আর এই কৌতূহলই একসময় মানুষকে তার প্রকৃত আবেগের জায়গায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। তিনি এমন প্রযুক্তির অংশ হতে চেয়েছিলেন, যা গোটা বিশ্বকে বদলে দেবে এবং মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে নতুন রূপ দেবে। এই তাগিদ থেকেই তিনি নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা ছেড়ে সরাসরি প্রযুক্তি খাতে যুক্ত হন।
তিনি বলেন, আর্থিক খাতের অভিজ্ঞতা প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের ক্ষেত্রে একটি কার্যকর সেতু হিসেবে কাজ করেছে। অ্যানালগ যুগে বেড়ে ওঠা থেকে ডিজিটাল রূপান্তরের সময় ক্যারিয়ার গড়া এবং বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দেওয়া, এই পুরো যাত্রা থেকে তিনি শিখেছেন যে প্রযুক্তি কেবল হার্ডওয়্যার বা কোডিং নয়, বরং মানুষের সুপ্ত সম্ভাবনাকে সামনে আনার এবং একটি অর্থবহ গল্পকে বৈশ্বিক মঞ্চে পৌঁছে দেওয়ার একটি মাধ্যম।
বক্তব্যের শেষ ভাগে তিনি স্নাতকদের উদ্দেশে বলেন, তাঁরা কর্মজীবনে প্রবেশ করছেন এমন এক সময়ে, যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাবে পরিবর্তন সাধারণ হারে নয়, বরং চক্রবৃদ্ধি হারে ও অভাবনীয় গতিতে ঘটছে। তিনি পরামর্শ দেন, অজানাকে আগ্রহভরে জানার চেষ্টা করতে, এমন পরিবেশে যুক্ত হতে যেখানে নিজে সবচেয়ে কম অভিজ্ঞ এবং অনিশ্চয়তাকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে। পাশাপাশি তিনি মেধাবী সহপাঠীদের গড়ে তোলা নেটওয়ার্কের ওপর আস্থা রাখার আহ্বান জানান, কারণ কঠিন সময়ে এই কমিউনিটিই একে অপরকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করে।
সবশেষে তিনি বলেন, শিক্ষার পাসপোর্ট যেখানেই কাউকে নিয়ে যাক না কেন, কৌতূহলকে সব সময় সঙ্গে রাখা প্রয়োজন, কারণ কৌতূহলই নতুন জগতের পথ দেখায়। তিনি সৃজনশীলতা ও ভেতরের আনন্দকে ধরে রাখার তাগিদ দিয়ে বলেন, এই প্রজন্মই হবে ইতিবাচক উদ্ভাবনের একটি নতুন যুগের নেতৃত্বদানকারী।





Add comment