হলিউডের মর্যাদাপূর্ণ একাডেমি অ্যাওয়ার্ডসের এবারের আসর ছিল বিশেষভাবে বহুমাত্রিক। ভৌতিক ঘরানার সিনেমার সাফল্য, প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বড় স্টুডিওর আধিপত্য—সব মিলিয়ে এবারের অস্কার রাতটি আলোচিত হয়েছে বিভিন্ন কারণে। এখানে এই বছরের আসরের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হলো।
ওয়ার্নার ব্রাদার্সের প্রাধান্য
এবারের অস্কারে সবচেয়ে বড় সাফল্য এসেছে ওয়ার্নার ব্রাদার্সের পক্ষ থেকে। স্টুডিওটির দুটি প্রধান ছবি ‘ওয়ান ব্যাটল ব্যাটল আফটার’ এবং ‘সিনার্স’ পুরো মৌসুম জুড়ে আলোচনায় ছিল। শেষ পর্যন্ত ওয়ার্নার ব্রাদার্স মোট ১১টি অস্কার জিতেছে, যা অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষভাবে ‘ওয়ান ব্যাটল ব্যাটল আফটার’ সেরা চলচ্চিত্রসহ ছয়টি অস্কার জিতেছে। ছবিটির পরিচালক ব্যক্তিগতভাবে তিনটি অস্কারের মালিক হয়েছেন।
প্রাণবন্ত সঞ্চালনা
এই বছরও অনুষ্ঠানের সঞ্চালক ছিলেন কৌতুক অভিনেতা কোনান ও’ব্রায়েন। গত বছরের তুলনায় তাকে আরও আত্মবিশ্বাসী ও প্রাণবন্ত দেখা গেছে। অনুষ্ঠানের শুরুতেই বিভিন্ন চলচ্চিত্রের সেটে অভিনব কমেডি স্কেচে দর্শকদের মনোরঞ্জন করেছেন। অনুষ্ঠানের মাঝামাঝি সময়ে সাবেক এক অস্কার সঞ্চালকের উপস্থিতি এবং তুলনামূলক বিষয় আলোচনা হলেও দর্শকরা মনে করেছেন, বর্তমানে ও’ব্রায়েনই সবচেয়ে উপযুক্ত সঞ্চালক।
সেরা অভিনেতার পুরস্কারে চমক
অনেকের প্রত্যাশা ছিল যে সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিততে পারেন টিমোথি শ্যালাম। ‘মার্টি সুপ্রিম’–এ তার অভিনয় প্রশংসিত হয়েছে। তবে দীর্ঘ প্রচারণা এবং পুরস্কার মৌসুমের ক্লান্তি তার বিপক্ষে作用 করেছে। শেষ পর্যন্ত সেরা অভিনেতার খেতাব জিতেছেন মাইকেল বি জার্ডন। তিনবার মনোনয়ন পাওয়া সত্ত্বেও শ্যালাম এবার খালি হাতে ফিরে গেলেন। একাডেমির ভোটাররা প্রায়শই কম বয়সী অভিনেতাদের অস্কার দেওয়া থেকে বিরত থাকেন—৩০ বছর বয়সী শ্যালামের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য হয়েছে।
ভৌতিক ঘরানার উজ্জ্বলতা
এবারের অস্কারে ভৌতিক ঘরানার সিনেমা গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছে। ‘সিনার্স’ চারটি পুরস্কার জিতেছে, আর ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ তিনটি। হরর ছবি ‘ওয়েপনস’–এর জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর খেতাব জিতেছেন অ্যামি ম্যাডিগন। দীর্ঘ সময় ধরে অস্কারে হরর ছবিকে অবহেলা করা হতো, এবারের ফলাফল সেই ধারনাকে কিছুটা পাল্টে দিয়েছে।
রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রভাব
এবারের অস্কারে রাজনৈতিক বক্তব্যও ছিল প্রাধান্যপূর্ণ। এক অভিনেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ বললে দর্শকরা করতালিতে মুখরিত হন। অন্যদিকে, সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের পুরস্কার প্রাপ্ত ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’র পরিচালক রাজনৈতিক নেতাদের সমালোচনা করেছেন। এছাড়া, সেরা চলচ্চিত্রের পরিচালক তাঁর বক্তব্যে বলেন, ‘আমরা পৃথিবীকে যে বিশৃঙ্খল অবস্থায় রেখে যাচ্ছি, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ক্ষমা চাওয়ার মতো।’
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উদ্বেগ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব বাড়তে থাকায় এবারের অস্কারে প্রযুক্তি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে। অনুষ্ঠান চলাকালীন বেশ কিছু মন্তব্য উঠে এসেছে যে ভবিষ্যতে হয়তো মানুষ নয়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করতে পারে। অ্যানিমেশন বিভাগে পুরস্কার প্রদানকালে একজন অভিনেতা বলেন, ‘অ্যানিমেশন কেবল একটি প্রম্পট নয়, এটি একটি শিল্প—যা সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।’
নারীদের গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য
নারীদের অংশগ্রহণ এবারের অস্কারে বিশেষভাবে নজরকাড়া। ‘সিনার্স’-এর জন্য সেরা চিত্রগ্রাহকের খেতাব জিতেছেন একজন নারী, যিনি প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী হিসেবে এই পুরস্কার পেয়েছেন। এই বিভাগে এর আগে মাত্র তিন নারী মনোনয়ন পেয়েছিলেন। পুরস্কার গ্রহণকালে তিনি নির্মাতা রায়ান কুগলারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং নারীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। অন্যদিকে, ‘হ্যামনেট’-এ অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর খেতাব জিতেছেন জেসি বাকলি।
আন্তর্জাতিক সিনেমার কিছু হতাশা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক সিনেমা অস্কারে বেশ সাফল্য পেতেও এবার সেই ধারা কিছুটা কমে গেছে। নরওয়ের ‘সেন্টিমেন্টাল ভ্যালু’ সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছে, তবে অন্য বিভাগে তেমন সফল হয়নি। সেরা পার্শ্ব অভিনেতার খেতাব জিতে সেলিব্রিটি শন পেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না, যিনি ইউক্রেন সফরে গিয়েছিলেন। মঞ্চে পুরস্কার গ্রহণকালে কিরন কালকিন মজার ছলে বলেন, ‘শন পেন এখানে আসতে পারেননি বা হয়তো আসতে চেয়েছিলেন না।’
অস্কারের এই আসর প্রমাণ করেছে, সিনেমা শুধু বিনোদন নয়, এটি প্রযুক্তি, সামাজিক বার্তা এবং নারীদের ক্ষমতায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত বহুমাত্রিক একটি শিল্প। এবারের ফলাফলে যেমন বড় স্টুডিওর প্রভাব ছিল, তেমনি নতুন ঘরানার সিনেমা এবং নারীর সাফল্যও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।





Add comment