হেবারমাসের মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে শোক

বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য গঠন তত্ত্ব এবং জনপরিসর ধারণার জন্য পরিচিত প্রখ্যাত জার্মান দার্শনিক ও সমাজবিজ্ঞানী ইয়ুর্গেন হেবারমাস আর নেই। জার্মানির স্টার্নবার্গ শহরে ৯৬ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। শনিবার তাঁর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান জুহকাম্প এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

যুদ্ধোত্তর জার্মানির বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে তাঁর প্রভাব ছিল অত্যন্ত গভীর। বহু বিশ্লেষকের মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের জার্মান সমাজে জনপ্রিয় বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তাঁর চিন্তাধারাই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব ফেলেছিল। প্রায় সাত দশকের দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি রাজনৈতিক দর্শন, সমাজতত্ত্ব এবং গণতান্ত্রিক আলোচনার ধারণাকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর বৌদ্ধিক অবদান জার্মানিকে বিভিন্ন সংকটময় সময়ে দিকনির্দেশনা দিয়েছে বলেও মনে করা হয়।

পঞ্চাশের দশকে ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা করে তিনি আলোচনায় আসেন। পরবর্তী সময়েও জার্মান সমাজে সামরিকবাদ ও চরম জাতীয়তাবাদের পুনরুত্থান নিয়ে তিনি সতর্কবার্তা দিয়ে গেছেন। এসব বিষয় নিয়ে তাঁর মন্তব্য এবং বিশ্লেষণ জার্মান রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে।

শুধু দীর্ঘ জীবন নয়, বরং তাঁর চিন্তাধারার পুনরায় প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠাও বর্তমানে আলোচনার বিষয়। এমন এক সময়ে তাঁর মৃত্যু হলো যখন জার্মান সমাজে যুদ্ধোত্তর শান্তিবাদী চেতনা ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে কট্টর ডানপন্থী রাজনৈতিক দল ‘অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি’ (এএফডি) দেশটির পার্লামেন্টে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে তাঁর দর্শন নতুন করে আলোচনায় এসেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

১৯২৯ সালের ১৮ জুন ডুসেলডর্ফে একটি মধ্যবিত্ত বুর্জোয়া পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এই দার্শনিক। জন্মের পর থেকেই ঠোঁটকাটা সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। শৈশবেই এ সমস্যার জন্য তাঁকে দুইবার অস্ত্রোপচার করাতে হয়েছিল। এর ফলে তাঁর কথা বলায় কিছুটা জড়তা ছিল। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী সময়ে ‘যোগাযোগ’ বা ‘কমিউনিকেশন’ বিষয়ক তাত্ত্বিক ভাবনার ওপর প্রভাব ফেলেছিল।

তিনি বেড়ে ওঠেন একটি কট্টর প্রোটেস্ট্যান্ট পরিবারে। তাঁর বাবা ছিলেন একজন অর্থনীতিবিদ, যিনি ১৯৩৩ সালে নাৎসি পার্টিতে যোগ দেন। তবে দার্শনিক নিজেই পরে উল্লেখ করেছিলেন যে তাঁর বাবা মূলত নিষ্ক্রিয় সমর্থক ছিলেন।

সেই সময়ের জার্মানির অনেক কিশোরের মতো তিনিও ‘হিটলার ইয়ুথ’-এ যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে মাত্র ১৫ বছর বয়সে সামরিক পুলিশের নজর এড়িয়ে তিনি নাৎসি বাহিনীতে নিয়োগ পাওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করতে সক্ষম হন।

বন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করার সময় তিনি তাঁর সহপাঠী উটে ভেসেলহফ্টের প্রতি আকৃষ্ট হন। আধুনিক শিল্পকলা, চলচ্চিত্র ও সাহিত্যের প্রতি তাঁদের দুজনেরই গভীর আগ্রহ ছিল। ১৯৫৫ সালে তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। গত বছর তাঁর স্ত্রী মৃত্যুবরণ করেন। তাঁদের সন্তান তিলমান ও জুডিথ জীবিত আছেন। তাঁদের আরেক সন্তান রেবেকা ছিলেন একজন আধুনিক ইতিহাসবিদ, যিনি ২০২৩ সালে মারা যান।

১৯৫০-এর দশকে সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদ হিসেবে তাঁর পরিচিতি গড়ে ওঠে। সেই সময় তিনি ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের চিন্তাধারা এবং মার্ক্সবাদী দার্শনিক থিওডোর অ্যাডর্নো ও ম্যাক্স হরখাইমারের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হন।

নিজের গবেষণায় তিনি ‘পাবলিক স্ফিয়ার’ বা জনপরিসরের ধারণাকে বিশ্লেষণ করেন। তাঁর মতে, আঠারো শতকের ইউরোপীয় বুর্জোয়া সমাজে যে ধরনের আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছিল, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে বিশ শতকে গণমাধ্যমনির্ভর জনপরিসরে রূপ নেয়। এই ধারণা সমাজবিজ্ঞান ও রাজনৈতিক দর্শনে গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

এই তত্ত্ব যুদ্ধোত্তর পশ্চিম জার্মান সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। নাৎসি একনায়কতন্ত্রের পতনের পর সেই সময়ের পশ্চিম জার্মানরা প্রথমবারের মতো স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক আলোচনা করার সুযোগ পাচ্ছিল। এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশে তারা এই ধারণার সঙ্গে পরিচিত হয়, যেখানে তৎকালীন রক্ষণশীল সরকার ভিন্নমতের প্রতি খুব বেশি সহনশীল ছিল না।

দার্শনিকের জীবনীগ্রন্থ ‘দ্য ফিলোসফার’-এর লেখকের মতে, যুদ্ধোত্তর জার্মান সমাজে তিনি এক ধরনের ‘জনতার দিশারি’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। উদারনৈতিক গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে জার্মান সমাজের সক্ষমতা নিয়ে তিনি যেমন আশাবাদী ছিলেন, তেমনি কিছু ক্ষেত্রে সংশয়ও প্রকাশ করেছেন।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed