হরমুজ বৈঠক স্থগিত, বাড়ল কূটনৈতিক সংকট

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে শান্তি ফেরাতে কূটনৈতিক উদ্যোগে নতুন করে ধাক্কা লেগেছে। হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল নিয়ে আলোচনার জন্য ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি দেশের মধ্যে যে বহুপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা ছিল, সেটি স্থগিত করা হয়েছে। আজ সোমবার ওমান এ বৈঠক স্থগিতের বিষয়টি জানিয়েছে। বৈঠকটি ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য শক্তিগুলোর মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল।

বৈঠক স্থগিতের খবর এমন সময়ে এল, যখন মধ্যপ্রাচ্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি তেল পরিবহনপথের আশপাশে নতুন করে হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে আগে থেকেই থাকা উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। একই সঙ্গে আজ বাজার খোলার পর জ্বালানি তেলের দামেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি জ্বালানি তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব। দেশটির তেল রপ্তানি নিয়েও এখন নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। গত শুক্রবার সৌদি আরবে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে। প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হামলার পর সপ্তাহান্তজুড়ে পাইপলাইনটি পুরোপুরি বন্ধ ছিল।

ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল রোববার রাতে জানান, সোমবার অনুষ্ঠেয় আঞ্চলিক বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ঐকমত্যের স্বার্থে’ আপাতত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। ওমানের পক্ষ থেকে বৈঠক স্থগিতের এই ঘোষণা মধ্যপ্রাচ্যে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টার গতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। একই সঙ্গে অদূর ভবিষ্যতে আঞ্চলিক সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনাও কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

তবে বৈঠকে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি ছিল ইরানের। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর সঙ্গে অনুষ্ঠেয় আলোচনায় ইরান অংশ নেবে। বৈঠকে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচল কীভাবে পরিচালনা করা হবে, সে বিষয়ে ওমানের সঙ্গে করা একটি চুক্তির বিষয় তুলে ধরার কথা ছিল।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র দেশটির সংবাদমাধ্যমকে জানান, এ অঞ্চলের কয়েকটি দেশের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ওমানে অনুষ্ঠেয় বৈঠকটি স্থগিত করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এ সিদ্ধান্ত তেহরান ও মাসকাট যৌথভাবে নিয়েছে। বৈঠকের নতুন তারিখ ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্ধারণ করা হবে বলেও তিনি জানান।

সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ তেল পাইপলাইন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তের পরপরই ইরান ও প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে অনুষ্ঠেয় বৈঠক স্থগিত হওয়ার খবর সামনে এল। বর্তমানে বন্ধ থাকা এই পাইপলাইনটি হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ফলে পাইপলাইনের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা একসঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানিবাহী জাহাজ চলাচলের পরিস্থিতিও এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। গতকাল যুক্তরাজ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলের সময় একটি বাণিজ্যিক জাহাজে অজ্ঞাত কোনো বস্তু আঘাত হানে। সেটি ক্ষেপণাস্ত্র নাকি ড্রোন, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট করা হয়নি। আঘাতের পর জাহাজটিতে আগুন ধরে যায়। পরিস্থিতি বিবেচনায় পরে জাহাজটির নাবিকদের সরিয়ে নেওয়া হয়।

এরপর ইরানের পক্ষ থেকেও হরমুজ প্রণালিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার তথ্য জানানো হয়েছে। দেশটির দাবি, ইরানের উপকূলের কাছে হরমুজ প্রণালিতে অবস্থানরত ওই জাহাজে হামলার ঘটনায় একজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও চারজন নাবিক আহত হয়েছেন।

হরমুজ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি পরিবহনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথ। এই পথকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা বা নৌ চলাচলে কোনো ধরনের বাধা তৈরি হলে তা আঞ্চলিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যেই সৌদি আরবের তেল পরিবহনের বিকল্প গুরুত্বপূর্ণ রুটের পাইপলাইন বন্ধ থাকা এবং হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

একদিকে যুদ্ধ ও সামরিক উত্তেজনা কমানোর জন্য আঞ্চলিক পর্যায়ে আলোচনা চালানোর চেষ্টা চলছে, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে। এর মধ্যে নির্ধারিত বৈঠক স্থগিত হওয়ায় কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা দ্রুত এগোতে পারবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে।

ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে হরমুজ প্রণালির নৌ চলাচল নিয়ে আলোচনাটি ছিল বর্তমান পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্যোগ। কিন্তু বৈঠকটি আপাতত স্থগিত হওয়ায় সমঝোতার পথে নতুন বাধা তৈরি হয়েছে। যদিও নতুন তারিখ নির্ধারণের বিষয়ে ওমান ও ইরানের মধ্যে সমন্বয়ের কথা জানানো হয়েছে, তবু বৈঠকটি কবে আবার অনুষ্ঠিত হবে, তা এখনো নির্ধারিত হয়নি।

এদিকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা এবং সৌদি আরবের তেল পাইপলাইনে ড্রোন হামলার মতো ঘটনাগুলো আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও প্রভাব ফেলছে। বাজার খোলার পর তেলের দাম বাড়ার ঘটনা সেই উদ্বেগেরই প্রতিফলন। ফলে কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি জ্বালানি পরিবহনের নিরাপত্তাও এখন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed