নয়াদিল্লিতে বসছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন

ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন উপলক্ষে সেজে উঠেছে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি। আজ শনিবার শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী এই আয়োজন। ইতিমধ্যে ডজনখানেকের বেশি বিশ্বনেতা দিল্লিতে জড়ো হয়েছেন এবং এই উপলক্ষে গোটা দিল্লির নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।

ধনী পশ্চিমা দেশগুলোর আধিপত্যাধীন অর্থনৈতিক জোটগুলোর বিপরীতে একটি ভারসাম্য সৃষ্টিকারী শক্তি হিসেবে ব্রিকস ক্রমেই নিজেদের অবস্থান মজবুত করছে। জোটভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক জোরদার করা ও সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়গুলোই এবারের সম্মেলনে বিশেষ গুরুত্ব পাবে।

তবে ব্রিকসের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, ইয়েমেনে সৌদি আরব ও ইরান-সমর্থিত হুতিদের মধ্যকার সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটকে কেন্দ্র করে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এই সম্মেলনকে জটিল করে তুলেছে। এর পাশাপাশি ভারত ও চীনের সীমান্ত বিরোধ নিয়ে জোটের সদস্যদের মধ্যে মতপার্থক্যও ক্রমেই বাড়ছে। এখন দেখার বিষয়, সদস্য দেশগুলো এসব মতপার্থক্য কীভাবে সামাল দেয় এবং সম্মেলনের আলোচ্যসূচিতে শেষ পর্যন্ত কোন কোন বিষয় গুরুত্ব পায়, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যেও আগ্রহ রয়েছে।

ব্রিকসের বর্তমান সদস্যসংখ্যা ও গঠন

ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা, এই পাঁচটি দেশের নামের আদ্যক্ষর নিয়েই ব্রিকসের নামকরণ করা হয়েছিল। ২০০৬ সালে একটি বাণিজ্য জোট হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই জোটের প্রাথমিক সদস্য ছিল ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীন, ২০১০ সালে যুক্ত হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। পরবর্তী সময়ে জোটের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। ২০২৩ সালে মিসর, ইথিওপিয়া, সৌদি আরব, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত জোটে যুক্ত হয়। একই সময়ে আর্জেন্টিনাকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, তবে দেশটির নতুন প্রেসিডেন্ট পশ্চিমাঘেঁষা নীতির কথা জানিয়ে জোটে যোগদান থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়া জোটে যোগ দেয়, ফলে বর্তমানে ব্রিকসের মোট সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১টি দেশে। এই দেশগুলো মিলে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৯ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করে এবং বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সম্মেলনে যেসব নেতা উপস্থিত থাকছেন

আয়োজক দেশ হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী স্বাগত জানাচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট, চীনের প্রেসিডেন্ট ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্টকে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, চীনের প্রেসিডেন্ট সাত বছর পর ভারত সফরে এসেছেন। তবে ব্রিকসের প্রাথমিক সদস্য হলেও ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট এবারের সম্মেলনে সশরীর অংশ নিচ্ছেন না, দেশীয় নির্বাচন নিয়ে ব্যস্ততার কারণে তাঁর পরিবর্তে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রতিনিধিত্ব করছেন।

এ ছাড়া সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট, মিসরের প্রেসিডেন্ট, ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট ও ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী। সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের যুবরাজও এবারের সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। পাশাপাশি ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট, কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট, বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট, নাইজেরিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্ট, উগান্ডার ভাইস প্রেসিডেন্ট, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী, ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী, কিউবা ও উরুগুয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও ভারতে পৌঁছেছেন। জাতিসংঘের মহাসচিব, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মহাপরিচালকও সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন।

আলোচ্যসূচিতে যা গুরুত্ব পাচ্ছে

পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশ্বিক আধিপত্যের বিপরীতে জোরালো অবস্থান নেওয়াই ব্রিকসের মূল লক্ষ্য, বিশেষ করে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে। জোটের নথিপত্র অনুযায়ী, এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে সহনশীলতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে তোলাকে কেন্দ্র করে। বাণিজ্য, জ্বালানি সহযোগিতা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি বিষয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে সদস্য দেশগুলোর অর্থনীতি শক্তিশালী করার বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে সম্মেলনে।

একজন আর্থিক বিশ্লেষকের মতে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকা রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে আন্তসীমান্ত লেনদেনের বিভিন্ন প্রক্রিয়া নিয়েও নেতারা আলোচনা করতে পারেন, যদিও ডলারের বিকল্প খোঁজার মতো কোনো উদ্যোগ নেওয়ার সম্ভাবনা কম বলেই তাঁর ধারণা। এদিকে রাশিয়া জানিয়েছে, সম্মেলনে অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে ডিজিটাল মুদ্রায় বাণিজ্যিক লেনদেন নিষ্পত্তির বিষয়ে তারা আলোচনা করবে। একজন গবেষকের ভাষ্যে, নেতাদের মূল আলোচ্য বিষয় হবে মূলত সরবরাহব্যবস্থার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ঝুঁকি কমিয়ে আনা।

ইরান ও ইউক্রেন যুদ্ধ প্রসঙ্গ

চলতি বছরের সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলা ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। গত মে মাসে সদস্যদেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এ নিয়ে যৌথ নিন্দা জানানোর একটি উদ্যোগ নিলেও তা সফল হয়নি। এবারের সম্মেলনে ইরানের প্রেসিডেন্ট নিজে অংশ নিচ্ছেন এবং যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি প্রেসিডেন্ট হিসেবে তাঁর প্রথম ভারত সফর, পাশাপাশি আট বছর পর কোনো ইরানি প্রেসিডেন্টের ভারত সফরও বটে।

একজন বিশ্লেষকের মতে, ইরান ব্রিকসের সদস্য হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত বাণিজ্য পথ, জ্বালানি সরবরাহ ও বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে, যার আঁচ পড়ছে গোটা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, একই সময়ে ব্রিকসের আরেক সদস্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সংঘাত সদস্যদেশগুলোর জন্য অভিন্ন অবস্থান নেওয়া কঠিন করে তুলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার জবাবে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে, যার শিকার হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতও। এ পর্যন্ত আমিরাতে ইরানি হামলায় ১৫ জন নিহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে দুজন সামরিক সদস্য, একজন বেসামরিক ঠিকাদার ও ১২ জন সাধারণ নাগরিক। পরিস্থিতির জেরে গত আগস্টে ইরানের বিরুদ্ধে অনির্দিষ্টকালের বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা জারি করে আরব আমিরাত।

অন্যদিকে ব্রিকসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে, এবং এবারের সম্মেলনেও এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। একজন বিশ্লেষকের ধারণা, এ বছর এই ইস্যুতে জোটের অভ্যন্তরে বড় কোনো মতবিরোধ তৈরি হবে না, কারণ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া নিজেরাই যুদ্ধ বন্ধের একটি কৌশল নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূতরা মস্কোয় গিয়ে রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন।

সম্মেলনটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার সম্পর্ক ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে এই সম্মেলন রুশ প্রেসিডেন্টকে বৈশ্বিক দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক তুলে ধরার একটি সুযোগ করে দেবে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটনের অনিশ্চিত বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নীতির বিপরীতে বিকল্প খোঁজার আগ্রহকে কাজে লাগানোর সুযোগও পাবে রাশিয়া ও চীন।

এবারের সম্মেলনের সময়টিও কৌশলগতভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, চলতি বছরই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দ্বিতীয় দফার শীর্ষ বৈঠকের আগে ব্রিকস নেতারা একত্র হচ্ছেন, আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মধ্যকার বৈঠক। চীনের একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তার মতে, চীন ও ভারতের সম্পর্ক বেশ কিছুদিন ধরেই কিছুটা শীতল থাকায় এই সম্মেলন দুই দেশের নেতাদের জন্য পারস্পরিক মতপার্থক্য কমানোর একটি ভালো সুযোগ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁর ভাষায়, চলমান যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে এবারের ব্রিকস সম্মেলন বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থায় সম্ভাব্য বড় পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত বহন করছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed