যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বর্ণ কেন সরিয়ে নিচ্ছে ধনী দেশগুলো?

নেদারল্যান্ডসের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ সপ্তাহে নিশ্চিত করেছে, তারা উত্তর আমেরিকা থেকে নিজেদের কয়েক টন স্বর্ণ সরিয়ে নিয়েছে। ব্যাংকটি বলেছে, এই স্থানান্তরের ফলে তারা “গুরুতর সংকটের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত” থাকবে। শনিবার সংবাদসংস্থা বিবিসির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডায় সংরক্ষিত মোট প্রায় ৩১৩ টন স্বর্ণের মধ্যে ৮৬ টন ‘ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে’ লন্ডনে স্থানান্তর করা হয়েছে জানিয়ে ব্যাংকটি বলেছে, এর ফলে এই মূল্যবান ধাতুটি “সংকট পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য সহজলভ্য” থাকবে। এরপর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে ডাচরা কেন এমন করছে? তারা কি সামনে কোনো বড় অর্থনৈতিক ধাক্কার আশঙ্কা করছে?

মনে হচ্ছে তা নয়। তবে এই পদক্ষেপ স্পষ্টভাবেই এমন এক বিশ্বের প্রতিক্রিয়া, যা বর্তমানে অস্থিতিশীল ও অনিশ্চিত অবস্থায় রয়েছে। বাণিজ্য ও সামরিক সংঘাত দেশগুলোকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে এবং তাদের স্বর্ণ নিজ দেশের কাছাকাছি রাখতে উৎসাহিত করছে। এ বছরের শুরুতে ফ্রান্স ঘোষণা দেয় যে তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ দেশে ফিরিয়ে এনেছে।
এদিকে জার্মানির বুন্ডেসব্যাংক ২০১৬ সালের মধ্যে বিদেশি সংরক্ষণাগার থেকে ২১৬ টনের বেশি স্বর্ণ স্থানান্তর করে, এর মধ্যে ১১১ টন নিউ ইয়র্ক থেকে এবং ১০৫ টন প্যারিস থেকে আনা হয়। বিশ্বব্যাপী অস্থিরতার সময়ে এর আগেও এমন কৌশল দেখা গেছে। গোল্ডম্যান স্যাকস-এর গবেষণা বিশ্লেষক লিনা থমাস ও ডান স্ট্রুইভেন বলেছেন, ‘শীতল যুদ্ধের সময় কিছু ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের স্বর্ণের একটি অংশ নিউ ইয়র্কে স্থানান্তর করেছিল।’

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের জ্যেষ্ঠ বাজার কৌশলবিদ জোসেফ কাভাতোনি বিবিসিকে বলেন, ‘যুদ্ধ এবং বাণিজ্যগত উত্তেজনা এই সিদ্ধান্তগুলোর কিছু ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলেছে, তবে তা প্রেরণার কারণগুলোর তালিকার শীর্ষে নয়।’ মুদ্রাস্ফীতি, সুদের হার এবং দ্রুত লেনদেন করা যায় এমন স্থানে স্বর্ণ রাখা, এসব বিষয়ও ভূমিকা রেখেছে।

কাভাতোনি বলেন, ‘আমি মনে করি না যে কোনো আসন্ন বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। তবে আমি মনে করি মানুষ এখন তাদের রিজার্ভ সম্পদ কীভাবে পরিচালনা করতে হবে, কীভাবে তা বাড়াতে হবে এবং কীভাবে সেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে আরও ভালোভাবে অবগত হচ্ছে।’ দে নেদারল্যান্ডসে ব্যাংক জানিয়েছে, এ বছরের মার্চ থেকে আগস্টের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে সরিয়ে আনা স্বর্ণ এখন ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড-এর ভল্টে সংরক্ষিত রয়েছে।

ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর ওলাফ স্লেইপেন বলেন, ‘আমরা আশা করি কখনও এগুলো ব্যবহারের প্রয়োজন হবে না, তবে আমাদের স্থিতিস্থাপকতা ও প্রস্তুতি শক্তিশালী করতে হবে।’ বিশ্বের প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোর একটি হওয়ায় লন্ডনকে সেরা বিকল্প হিসেবে দেখা হয়েছে।

কোনো সংকটের সময় যদি দ্রুত স্বর্ণ কেনাবেচা করতে হয়, তাহলে লন্ডনই সবচেয়ে উপযোগী স্থান। এ কারণেই ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড স্বর্ণ সংরক্ষণের জন্য জনপ্রিয় একটি কেন্দ্র। ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড বিশ্বে স্বর্ণ গচ্ছিত রাখা সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। মধ্য লন্ডনের এই ৩০০ বছর পুরোনো প্রতিষ্ঠানের নিচে চার লাখের মতো স্বর্ণের বার সংরক্ষিত রয়েছে, যার মূল্য ২০০ বিলিয়ন পাউন্ডেরও বেশি।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের শিল্পখাতভিত্তিক জরিপ অনুযায়ী, ব্যাংক অফ ইংল্যান্ড এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় ভল্টিং কেন্দ্র। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ক্রমেই মূল্যবান এই ধাতু কোথায় সংরক্ষণ করবে, সে ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য আনছে।

গোল্ডম্যান স্যাকস-এর থমাস ও স্ট্রুইভেনের মতে, কোনো দেশের স্বর্ণ কোথায় সংরক্ষণ করা হবে, তা এখন “রিজার্ভ ব্যবস্থাপকদের ভাবনার কেন্দ্রে ক্রমশ চলে আসছে”। আধুনিক বিশ্বে সম্পদ স্থানান্তরের বহু উপায় রয়েছে।

ডাচরা নিউ ইয়র্কে প্রায় ৫৯ টন স্বর্ণ বিক্রি করে লন্ডনে সমপরিমাণ নতুন মজুত কিনেছে। ফলে ওই পরিমাণ স্বর্ণ আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে পরিবহন করার প্রয়োজন পড়েনি। তবে ২৭ টনের বেশি স্বর্ণ যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে নেদারল্যান্ডসের জাইস্ট শহরে ‘বাহ্যিকভাবে স্থানান্তর’ করা হয়েছে। একই পরিমাণ স্বর্ণ জাইস্ট থেকে লন্ডনেও পাঠানো হয়েছে।
এ ধরনের কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে অভিযান পরিচালনা করে, সে বিষয়ে সাধারণত মুখ খোলে না। তবে বাস্তব জীবনের ঝুঁকি এড়াতে নিরাপত্তা ও পরিকল্পনার মাত্রা যে ব্যাপক, তা বলাই যায়।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের কাভাতোনি বলেন, ‘স্বর্ণ স্থানান্তরের একটি প্রচলিত পদ্ধতি হচ্ছে এক জায়গায় বিক্রি করে অন্য জায়গায় কেনা।’
তিনি বলেন, ‘ধরা যাক, আমি চাই আমার স্বর্ণ নিউ ইয়র্কে থাকুক, কিন্তু সেটি লন্ডনে রয়েছে। আমি লন্ডনে তা বিক্রি করতে পারি, একই দিনে একই সময়ে নিউ ইয়র্কে কিনতে পারি। কার্যত এটি একটি হিসাবভিত্তিক স্থানান্তর, যেখানে অন্য কোনো লজিস্টিক পরিবর্তনের প্রয়োজন হয় না।’

সীমান্ত পেরিয়ে স্বর্ণ পরিবহনের কাজ করে এমন প্রতিষ্ঠান খুব বেশি নেই। এর মধ্যে একটি হলো ব্রিংক’স গ্লোবাস সার্ভিসেস। প্রতিষ্ঠানটি বিবিসিকে জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে তারা কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ‘চাহিদা বৃদ্ধি’ লক্ষ্য করেছে।

ব্রিংক’স-এর নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট নাদের আন্তার বলেন, ‘ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বৃদ্ধি, পাশাপাশি কৌশলগত রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব, এই প্রবণতায় অবদান রাখছে বলে মনে হচ্ছে।’ তবে গোল্ডম্যান স্যাকস-এর থমাস ও স্ট্রুইভেন বলেন, ‘দেশে স্বর্ণ সংরক্ষণ করতে খরচ হয়।’

তারা বলেন, ‘দেশীয় সংরক্ষণের জন্য শারীরিক নিরাপত্তা, নিরীক্ষা অবকাঠামো এবং বীমায় বিনিয়োগ করতে হয়। ছোট কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর জন্য এসব খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।’
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, গত চার বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বছরে গড়ে এক হাজার টন স্বর্ণ সংগ্রহ করেছে। এর আগের দশকে এই গড় ছিল ৫০০ টন।

এই প্রবণতার শিকড় বৈশ্বিক আর্থিক সংকট পর্যন্ত বিস্তৃত এবং আগামী বছর এই পরিমাণ আরও বাড়বে বলেই প্রত্যাশা করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে স্বর্ণের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর দাম ধারাবাহিকভাবে নতুন রেকর্ড গড়েছে এবং জানুয়ারিতে প্রতি আউন্স পাঁচ হাজার ডলার অতিক্রম করেছে।

দাম বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। তবে প্রধান কারণগুলোর একটি হলো আর্থিক ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে, বিশেষ করে বাণিজ্য ও সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে, স্বর্ণকে একটি তথাকথিত নিরাপদ বিনিয়োগ সম্পদ হিসেবে দেখা হয়। মুদ্রাস্ফীতি এবং সুদের হারও স্বর্ণের জনপ্রিয়তাকে প্রভাবিত করে।

স্বর্ণের সীমিত প্রাপ্যতা এবং হাজার বছরের ইতিহাসজুড়ে এর ওপর আরোপিত মূল্যের কারণে এটি মূল্যস্ফীতির প্রভাবের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে প্রতিরোধী। তাই একে ভালো বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিনিয়োগ ব্যাংক চার্লস শোয়াব-এর মতে, ‘গত অর্ধশতকে স্বর্ণের দাম ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) থেকে অনেক দ্রুত বেড়েছে, যা মুদ্রাস্ফীতির সবচেয়ে বেশি পর্যবেক্ষণ করা সূচক।’

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed