মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের এক প্রতিবেদনে ইরানে হামলা শুরুর দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে গত ৩০ জুন পর্যন্ত যুদ্ধে ওয়াশিংটনের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির একটি বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ১১ মডেলের অন্তত ৫২টি যুদ্ধবিমান ও ড্রোন ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই তালিকায় সামনের সারির যুদ্ধবিমান ও অ্যাটাক এয়ারক্রাফট থেকে শুরু করে আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার বিমান এবং উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার, সবকিছুই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের মহাপরিদর্শকের দপ্তর থেকে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে এই ক্ষয়ক্ষতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। গত সোমবার প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে ইরানে হামলা শুরুর দিন থেকে গত ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কালে যুদ্ধে ওয়াশিংটনের সামরিক ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত বিবরণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দুই আসনবিশিষ্ট ও প্রায় তিন কোটি ডলার মূল্যের এফ-১৫ই মডেলের অন্তত চারটি মার্কিন যুদ্ধবিমান ধ্বংস হয়েছে। আকাশ থেকে ভূমিতে এবং আকাশ থেকে আকাশে হামলার জন্য এই যুদ্ধবিমানগুলো ব্যবহৃত হয়ে থাকে। গত ১ মার্চ অন্তত তিনটি যুদ্ধবিমান কুয়েতে ফ্রেন্ডলি ফায়ারে ভূপাতিত হয়। এই মডেলের চতুর্থ যুদ্ধবিমানটি গত এপ্রিলে ইরান গুলি করে নামায়। তবে সব যুদ্ধবিমানের পাইলটকেই নিরাপদে উদ্ধার করতে সক্ষম হয় ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাধুনিক ও অত্যন্ত মূল্যবান এফ-৩৫এ মডেলের স্টিলথ মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান, যা প্রতিপক্ষের সুরক্ষিত আকাশসীমা ভেদ করতে সক্ষম, তার অন্তত একটি গত মার্চে ইরানের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ছাড়া মূলত পদাতিক বাহিনীকে সরাসরি বা কাছাকাছি আকাশ থেকে সহায়তা দিতে সক্ষম এ-১০ মডেলের অ্যাটাক এয়ারক্রাফটের অন্তত একটিও ইরানের হামলায় ভূপাতিত হয়েছে।
মার্কিন যুদ্ধবিমানের উড্ডয়নসীমা ও স্থায়িত্ব বাড়াতে ব্যবহৃত কেসি-১৩৫ মডেলের বিশাল আকারের ট্যাংকার বিমানের অন্তত সাতটি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। গত ১২ মার্চ ইরাকে জ্বালানি সরবরাহ মিশন চলাকালে এ ধরনের একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়, যাতে ছয়জন ক্রু সদস্যই নিহত হন। এ ছাড়া সৌদি আরবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় ভূমিতে থাকা এই মডেলের পাঁচটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর সপ্তম বিমানটিও ওই একই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় সামগ্রিক হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানের হামলায় আগাম আকাশ-সতর্কবার্তা ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার জন্য ব্যবহৃত ই-৩ সেন্ট্রি মডেলের অন্তত একটি বিমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সন্ধান ও উদ্ধার অভিযান পরিচালনার সময় ইরানের হামলায় চার ব্লেড ও জোড়া ইঞ্জিনের এইচএইচ-৬০ডব্লিউ মডেলের একটি সামরিক ইউটিলিটি হেলিকপ্টারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
প্রধানত সামুদ্রিক গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারির কাজে ব্যবহৃত প্রায় ২৪ কোটি ডলার মূল্যের উচ্চ-উচ্চতার দীর্ঘস্থায়ী মানুষবিহীন এমকিউ-৪সি ট্রাইটন ড্রোনের অন্তত একটি গত এপ্রিলে বিধ্বস্ত হয়। এ ছাড়া ইরানে একটি যুদ্ধকালীন অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চালানোর সময় উদ্ধার করা সম্ভব না হওয়ায় মার্কিন বাহিনী নিজেরাই চারটি এএইচ-৬ হেলিকপ্টার ধ্বংস করে দেয়।
দুজন ক্রুর জন্য পরপর সাজানো ককপিটসহ নির্মিত জোড়া ইঞ্জিন ও চার ব্লেডের অ্যাটাক হেলিকপ্টার এএইচ-৬৪ অ্যাপাচির অন্তত একটি গত ৮ জুন হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এলাকায় গুলি করে নামায় ইরানের বাহিনী। এ ছাড়া মার্কিন নৌবাহিনীর এমএইচ-৬০এস মডেলের একটি হেলিকপ্টার গত ১ জুলাই আরব সাগরে বিধ্বস্ত হয়, যাতে থাকা চারজন ক্রু সদস্যের মধ্যে তিনজনকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা গেলেও চতুর্থ ক্রু সদস্যকে খুঁজে না পেয়ে নিখোঁজ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হয়েছে নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও নিখুঁত নিশানায় আঘাত হানার কাজে ব্যবহৃত দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র চালকবিহীন বিমান এমকিউ-৯ রিপার, যার অন্তত ৩০টি ধ্বংস হয়েছে। এই সংখ্যাটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা মোট ক্ষয়ক্ষতির একটি বড় অংশজুড়ে রয়েছে।
তবে ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এর চেয়েও বেশি। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এলাকায় একাধিকবার মার্কিন নজরদারি ও অ্যাটাক ড্রোন গুলি করে নামানোর দাবিও রয়েছে। এ ছাড়া চলতি মাসের শুরুর দিকে তেহরান যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাবমার্সিবল বা চালকবিহীন সাবমেরিনও জব্দ করার দাবি জানিয়েছে।





Add comment