কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ছদ্মবেশ ধরে প্রতারকেরা ইতালির সবচেয়ে বড় ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের একটি প্রাইভেট ব্যাংকিং শাখা থেকে ৯ কোটি ৫০ লাখ ইউরো, বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১০ কোটি ৮০ লাখ ডলারের সমান, হাতিয়ে নিয়েছে। গত শুক্রবার বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র এ তথ্য জানিয়েছে। সূত্রগুলো আরও জানায়, হাতিয়ে নেওয়া অর্থের একটি অংশ পরবর্তী সময়ে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ ইউরোর এখনো কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
জালিয়াতির এই ঘটনাটি প্রথম প্রকাশ করে ইতালির একটি সংবাদমাধ্যম। তাদের তথ্য অনুযায়ী, অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়াটি শুরু হয় চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে, যখন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং শাখার তৎকালীন চেয়ারম্যান মূল ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার পাঠানো বলে মনে হওয়া একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা পান। বার্তাটিতে একটি বৈদেশিক লেনদেনের জন্য জরুরি সহায়তা চাওয়া হয়েছিল।
নির্দেশনার সত্যতা যাচাইয়ের জন্য প্রতারকেরা একটি স্বনামধন্য আইনি প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ অংশীদারের নম্বর থেকে আসা বলে মনে হওয়া একটি ফলোআপ ফোনকলও করে। সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, ওই আইনজীবীর কণ্ঠস্বর হুবহু নকল করতে প্রতারকেরা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল। অনুরোধটিকে আসল বলে বিশ্বাস করে ওই চেয়ারম্যান নিজের অর্থ বিভাগকে প্রধানত চীন ও হংকংয়ের একাধিক বিদেশি অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ দেন বলে সূত্রগুলো জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট মূল ব্যাংক ও এর ব্যাংকিং শাখা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে জানা গেছে, শাখাটি দ্রুতই এই অর্থ স্থানান্তরে অনিয়ম শনাক্ত করে এবং বেশ কয়েকটি দেশের ব্যাংক ও কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি নিয়ে সতর্ক করে। সূত্রগুলোর ভাষ্যমতে, চীন, পর্তুগাল ও ইতালির কর্তৃপক্ষের যৌথ প্রচেষ্টায় পরবর্তী সময়ে প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ ইউরো উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে বাকি অর্থ বিভিন্ন বিদেশি অ্যাকাউন্টের একটি জটিল নেটওয়ার্কের মধ্য দিয়ে ঘুরে শেষ পর্যন্ত ক্রিপ্টোকারেন্সিতে রূপান্তরিত হয়ে যাওয়ায় সেগুলোর আর কোনো হদিস পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো।
সূত্রগুলো জানায়, এই ঘটনায় ওই চেয়ারম্যান বা ব্যাংকিং শাখার অন্য কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোনো তদন্ত চলছে না। তবে মিলানের প্রসিকিউটররা কম্পিউটার জালিয়াতির সন্দেহে ইউরোপের বাইরে বসবাসকারী এক বিদেশি নাগরিককে তদন্তের আওতায় এনেছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। উল্লেখ্য, ওই চেয়ারম্যান গত মার্চ মাসে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে নিজের পদ থেকে পদত্যাগ করেন, যদিও সে সময় তাঁর পদত্যাগ নিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো বাড়তি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
এ ধরনের ঘটনা ইতালিতে এবারই প্রথম নয়। গত বছর দেশটির এক মন্ত্রীর কণ্ঠস্বর নকল করতে এআই ব্যবহার করে প্রতারকেরা একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ীকে একটি বিদেশি অ্যাকাউন্টে প্রায় ১০ লাখ ইউরো পাঠাতে প্ররোচিত করেছিল। যদিও সেই অর্থ পরবর্তী সময়ে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই-নির্ভর কণ্ঠস্বর জালিয়াতির এমন ঘটনা বিশ্বজুড়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ী মহলে নতুন এক ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে, যা মোকাবিলায় প্রচলিত যাচাই প্রক্রিয়ার পাশাপাশি আরও উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বেড়ে চলেছে।





Add comment