কে জানতো নিউইয়র্কের ব্যস্ত সড়কে লাশ হয়ে পড়ে থাকবেন আদরের নিশাত!
পিচ ঢালা কালো পথ রক্তে রঞ্জিত হবে। নিশাতের পরিবার তখনো জানতো না তাদের আদরের নিশাত আর কখনো বাসায় ফিরবে না ছোট বোনের জন্য কেক নিয়ে।
নিউইয়র্কের সড়কে বাংলাদেশি নিশাত জান্নাত (১৯) নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন গত মঙ্গলবার, ৩১ মার্চ। একটি ‘রয়েল’ গার্বেজ ট্রাকের বেপরোয়া চালক নিশাতকে পিশে মারলো কুইন্সের সড়কে। নিশাতের বাসা দুর্ঘটনাস্থল থেকে মাত্র কয়েক মিনিটের হাঁটা রাস্তা। রাত বেড়ে যাওয়ায় বাসায় নিশাতের জন্য পরিবারে সকলে অপেক্ষায় ছিলেন। কেন ফিরছেন না তা নিয়ে নানা জায়গায় খোঁজা হচ্ছিল। নিশাতের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়ায় তার পরিবারে উদ্বেগ ছিল চরমে।
নিহত নিশাতের বড় বোন নওশিন জানান, নিশাত ছিল পরিবারের সবচেয়ে আদরের এবং দায়িত্বশিল একজন বোন। কখন কার কি লাগবে, ফ্যামেলিতে কি দরকার, কে কোথায় যাবে সবদিকে ছিল তার খেয়াল। কাজ থেকে ফেরার পথে ছোট বোনের জন্য কেক আনতে গিয়েই না ফেরার দেশে চলে গেলেন নিশাত। তার স্বপ্ন ছিল পড়ালেখা শেষ করে অনেক বড় হবার।

বাংলাদেশের সিলেট থেকে নিশাতের পরিবার ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী হিসেবে আসেন। তার বাবা হেলাল আহমদ উডসাইডের একটি মসজিদের ইমাম। তাদের গ্রামের বাড়ি সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার রায়গড় গ্রামে। আমেরিকায় একটি সুন্দর জীবনের স্বপ্ন নিয়ে আসা এই পরিবারে এখন নেমে এসেছে নিস্তব্ধ এক শোকার্ত পরিবেশ। বাংলাদেশি কমিউনিটির বিশিষ্ট সমাজসেবক শাহ নেওয়াজসহ অনেকেই নিহত নিশাতের বাবার সাথে দেখা করে শোক জানিয়েছেন।
হাতে কেক নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে ট্রাক চালকের বেপরোয়া ধাক্কায় নিশাত গাড়ীর নিচে চলে যায়। ঘটনাস্থলেই তার জীবনের করুণ সমাপ্তি ঘটে। উডসাইড এলাকার রুজভেল্ট অ্যাভিনিউ, ৬২ স্ট্রিটের মোড়ে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। রাত তখন প্রায় ১২টা বাজে। কাজ শেষে ফেরার পথে ট্রেন থেকে নেমে ক্রসওয়াক দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন নিশাত। ঠিক সেই মুহূর্তে পশ্চিমমুখী একটি ‘রয়েল’ নামের গার্বেজ ট্রাক ডান দিকে মোড় নিতে গিয়ে তাকে প্রচন্ড গতিতে এসে ধাক্কা দেয়।
সড়কে থাকা মানুষ ছুটে আসেন। কেউ একজন খবর দেয় পুলিশকে। ঘটনাস্থলেই ইমার্জেন্সি মেডিকেল সার্ভিস (ইএমএস) তাকে মৃত ঘোষণা করে। সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত মর্মান্তিক এই খবর ছবিসহ ছড়িয়ে গেলে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন নিউইয়র্ক বাংলাদেশি কমিউনিটির অসংখ্য মানুষ।
ঘটনার দিন রাত বাড়ার সাথে সাথে পরিবারের মধ্যে উদ্বেগও বাড়তে থাকে। বড় বোন নওশিন জান্নাত নিশাতকে ফোনে না পেয়ে গভীর চিন্তায় পড়েন। পরে মোবাইলের লোকেশন ট্র্যাক করে ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা পুলিশ ও জরুরি বাহিনীর সদস্যদের দেখতে পান। চারপাশে শোকাহত মানুষের ভিড় আর এক নিথর দেহ সড়কে পড়েছিল সাদা কাপড়ে ঢাকা। সেটিই ছিল নিশাতের শেষ ঠিকানা। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শুরু হয় কান্নার রোল।

পড়াশোনার পাশাপাশি নিশাত জান্নাত কুইন্সের জ্যামাইকার একটি অফিসে পার্ট-টাইম রিসেপশনিস্ট হিসেবে কাজ করতেন। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে তিনি ছোট বোনের জন্য কেক কিনে আনতে গিয়েছিলেন।
নিশাত ছিলেন চার বোনের মধ্যে একজন। তার দুটি ছোট বোন রয়েছে, যাদের একজনের বয়স মাত্র ৯ বছর, আরেকজনের বয়স ৪ বছর। বড় বোন নওশিন জান্নাত কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “নিশাত সবসময় বলত, আশা রাখো, বর্তমানেই বাঁচো। সে নিজেই জানত না তার সময় এত কম।”
ঘটনার তদন্ত করছে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের হাইওয়ে ডিস্ট্রিক্টের কলিশন ইনভেস্টিগেশন স্কোয়াড। ট্রাকের চালক ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন এবং সামান্য আঘাতের চিকিৎসা নেন। এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। উডসাইড ও জ্যাকসন হাইটস এলাকায় অনেকেই গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন।

নিশাতের নামাজে জানাজা গত মঙ্গলবার জোহরের নামাজের পর উডসাইডের বায়তুল জান্নাহ মসজিদে অনুষ্ঠিত হয়। এসময় শতশত মানুষ জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। পরে তাকে নিউজার্সির একটি মুসলিম কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।





Add comment