ভবিষ্যতে কোনো ভয়াবহ যুদ্ধ, জলবায়ু বিপর্যয় বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে পৃথিবীর কৃষিব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেলে নতুন করে চাষাবাদ শুরু করার সুযোগ তৈরি রাখতে বিশ্বজুড়ে মাটির গভীরে গড়ে তোলা হয়েছে একাধিক হিমায়িত বীজব্যাংক। তবে এসব বীজব্যাংকে সংরক্ষিত ট্রপিক্যাল বা ক্রান্তীয় ফসলের বীজের প্রকৃত কার্যকারিতা নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে অস্ট্রেলিয়ার একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণায়।
গবেষকদের তথ্যমতে, সম্প্রতি একটি বীজব্যাংকে সংরক্ষিত এক ব্যাচ বীজের কার্যকারিতা পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রায় পঁয়তাল্লিশ বছর ধরে সংরক্ষণের পরও মুগ ডালের প্রায় ৯০ শতাংশ বীজের অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা এখনো ভালো অবস্থায় রয়েছে। এই ফলাফলের ভিত্তিতেই গবেষকেরা বলছেন, ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে মুগ ডাল একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে গবেষণায় আরও দেখা গেছে, সাধারণ ডালজাতীয় ফসলের বীজ তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে কম সময় সজীব থাকে। অন্যদিকে পিজিয়ন মটরশুঁটি নামের একটি বীজে সবচেয়ে কম হারে অঙ্কুরোদ্গম হয়েছে। গড়ে প্রায় ৯৬ বছর সংরক্ষণের পর মাত্র চারটি ব্যাচ বীজের ৮৫ শতাংশের বেশি অঙ্কুরোদ্গম ক্ষমতা টিকে থাকতে দেখা গেছে।
এত দিন ধারণা করা হতো, হিমায়িত অবস্থায় সংরক্ষিত বীজ শত শত বছর ধরে কার্যকর থাকতে পারে। তবে নতুন এই গবেষণা সেই প্রচলিত ধারণাকে অনেকটাই ভুল প্রমাণ করেছে। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ২০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যেই অনেক বীজের কার্যক্ষমতা ৮৫ শতাংশের নিচে নেমে গেছে।
গবেষক দলের একজন প্রধান বীজবিশেষজ্ঞ জানিয়েছেন, এমন বিরল ও দীর্ঘমেয়াদি পরীক্ষা পরিচালনা করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে, কারণ একবার নমুনা নষ্ট হয়ে গেলে তা আর ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তাঁর মতে, বিভিন্ন জিনব্যাংককে এখন থেকে নিয়মিত বিরতিতে সংরক্ষিত বীজের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান বাড়ানো গেলে উদ্ভিদের জিনগত সম্পদ সংরক্ষণের কাজ আরও সহজ হবে। নরওয়ের বিখ্যাত একটি বীজভান্ডারেও বিভিন্ন জাতের ফসলের বীজ সংরক্ষণ করা হয়, তবে শুধু বীজ জমা রাখলেই চলবে না, কয়েক দশক ধরে সেগুলোর যথাযথ যত্ন নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
গবেষকেরা এ-ও উল্লেখ করেছেন, গবেষণাগারে পরীক্ষার সময় কোনো বীজ অঙ্কুরিত হলেই তা পুরোপুরি একটি স্বাভাবিক গাছ হিসেবে বেড়ে উঠবে, এমন নিশ্চয়তা এখনই দেওয়া যাচ্ছে না। একটি সম্পূর্ণ উদ্ভিদে পরিণত হওয়ার প্রক্রিয়ায় আরও অনেক ধাপ পার হতে হয়, তাই বর্তমান পরীক্ষামূলক ফলাফলকে পূর্ণাঙ্গ সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করতে নারাজ বিজ্ঞানীরা। তবে তাঁদের মতে, এই গবেষণার মাধ্যমে পাওয়া নতুন তথ্য ভবিষ্যতের বীজ সংরক্ষণ মডেলগুলোকে আরও উন্নত করতে সহায়তা করবে এবং উদ্ভিদ প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্য দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।





Add comment