লোহিত সাগরে হুতিদের নিয়ন্ত্রণ, বন্ধ সৌদি পাইপলাইন

লোহিত সাগর দিয়ে নিজেদের তেল পরিবহনের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ করে দিয়েছে সৌদি আরব। হামলার শিকার হওয়ার পর তেল রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই পাইপলাইনটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় দেশটি। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার মধ্যেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় অপরিশোধিত তেল রপ্তানিকারক দেশ সৌদি আরব। ইরাকে সক্রিয় ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো এই হামলা চালিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে বাগদাদ ও রিয়াদ উভয় পক্ষই। হামলার পর আজ শনিবার ইরাকের একজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডারকে দায়িত্ব থেকে বরখাস্ত করা হয়েছে। ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের বিবৃতি অনুযায়ী, বরখাস্ত হওয়া ওই কমান্ডার দক্ষিণ-পূর্ব ইরাকের মাইসান প্রদেশে সামরিক অভিযান পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। ইরানের সীমান্তবর্তী এই প্রদেশকে দীর্ঘদিন ধরে ইরান-সমর্থিত শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাবাধীন এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

আরব উপদ্বীপজুড়ে বিস্তৃত প্রায় ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার বা ৭৪৫ মাইল দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি সৌদি আরবকে হরমুজ প্রণালির জাহাজ চলাচল জট এড়িয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ করে দিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাংকার চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই পাইপলাইনের গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়।

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার সকালে দেশটির রিয়াদ ও মদিনা অঞ্চলে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনে হামলা চালানো হয়। স্যাটেলাইট চিত্রে পবিত্র মদিনা নগরীর দক্ষিণে পাইপলাইনের একটি এলাকা থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা যায়। সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই হামলায় কয়েকজন আহত হয়েছেন এবং যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তবে তেল রপ্তানিতে এর প্রকৃত প্রভাব সম্পর্কে এখনো বিস্তারিত জানানো হয়নি। হামলার পরপরই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাইপলাইনটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এই হামলা এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা লোহিত সাগরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান ও বিশ্লেষকদের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই পাইপলাইন দিয়ে প্রতিদিন ৪০ থেকে ৫০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ৪ থেকে ৫ শতাংশের সমান।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এখন বাব আল-মানদেব প্রণালি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া এবং সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ ঘোষণার ফলে আরব উপদ্বীপের দুই দিকেই জ্বালানি সরবরাহে তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে গেছে।

ইয়েমেনের চারটি সরকারি সূত্র একটি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থাকে জানিয়েছে, গত শুক্রবার হুতিরা লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মানদেব প্রণালিতে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। সৌদি পাইপলাইনে হামলা ও পেরিম দ্বীপ দখলের এই দুই ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও বিপজ্জনকভাবে ছড়িয়ে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও কার্যত থমকে গেছে।

পাল্টা হামলার প্রস্তুতি

জাহাজ চলাচলের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পথ বাব আল-মানদেব প্রণালি এখন পুরোপুরি হুতি যোদ্ধাদের নিয়ন্ত্রণে বলে জানিয়েছে ইয়েমেনের স্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে একটি আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা। তাঁদের ভাষ্যমতে, গত বৃহস্পতিবার প্রণালির ঠিক মাঝে অবস্থিত ময়উন দ্বীপ থেকে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী প্রত্যাহারের পর সশস্ত্র হুতি যোদ্ধাদের বহনকারী নৌযান সেখানে পৌঁছায় এবং দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়, যার মধ্য দিয়ে পুরো প্রণালিতেই তাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সশস্ত্র ব্যক্তিরা এখন বাব আল-মানদেব উপকূলজুড়ে মোতায়েন রয়েছেন এবং সামরিক যানবাহনে টহল দিচ্ছেন।

গত সপ্তাহে বাব আল-মানদেব এলাকায় সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে হুতিদের আক্রমণ শুরুর পর কয়েক শ মানুষ নিহত হয়েছেন। ইয়েমেনি বাহিনী জানিয়েছে, তারা হুতিদের দখলে নেওয়া এলাকাগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা চালাবে। এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়েমেনের লোহিত সাগর উপকূল ধরে হুতিদের এই নাটকীয় অগ্রযাত্রায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী সরাসরি দিকনির্দেশনা দিয়েছে। ইরানের দুটি সূত্র জানিয়েছে, গত সপ্তাহে ইরান হুতিদের সৌদি আরবে হামলা আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছিল এবং এ কাজে সহায়তার জন্য অতিরিক্ত অর্থ, অস্ত্র ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পাঠানোর প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল।

ইরান হুতিদের নিজেদের মিত্র হিসেবে বর্ণনা করলেও প্রকাশ্যে তাদের সরাসরি সামরিক নির্দেশনা দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে আসছে। ইরানের ভাষ্য অনুযায়ী, হুতিরা তাদের প্রক্সি বাহিনী নয়। হুতিদের একজন সামরিক মুখপাত্র জানিয়েছেন, আগে থেকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা সৌদি জাহাজ ছাড়া বাকি সব জাহাজের জন্য এই সমুদ্রপথ এখনো নিরাপদ রয়েছে।

সৌদি আরবের সহায়তা প্রার্থনা

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র জানিয়েছে, হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা চেয়ে সৌদি যুবরাজ গত বৃহস্পতিবার অন্তত দুবার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে টেলিফোন করেন। এর আগে একটি মার্কিন সংবাদমাধ্যম বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল। সূত্র দুটি আরও জানায়, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে রিয়াদকে জানানো হয়েছে যে তারা আপাতত হুতিদের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নিতে আগ্রহী নয়, তবে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও হামলার লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সহায়তা দেবে।

দুই নেতার মধ্যে সরাসরি এই ফোনালাপ হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে সরাসরি কোনো জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউস। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জ্যেষ্ঠ মার্কিন প্রশাসনিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে ওয়াশিংটনের নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

এই ঘটনাপ্রবাহ এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ঘিরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও তাঁর দল রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed