যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন আটককেন্দ্রে থাকা শিশুদের মুক্তির দাবিতে নতুন করে সরব হয়েছেন এক জনপ্রিয় শিশু বিনোদনকর্মী। দক্ষিণ টেক্সাসের ডিলি ইমিগ্রেশন প্রসেসিং সেন্টারে আটক দুই শিশুর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলে তিনি জানান, তাদের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।
ভিডিও কলে কথা বলা এক শিশুর বক্তব্য ছিল, সে আর সেখানে থাকতে চায় না এবং সেখানে কিছুই ভালো লাগছে না। গত মার্চের শুরু থেকে নয় বছর বয়সী এক শিশু তার বাবা-মায়ের সঙ্গে ওই কেন্দ্রে আটক ছিল। সেখানে শিশুদের অভিযোগ, শিক্ষার সুযোগ সীমিত, সারাক্ষণ আলো জ্বলে থাকে এবং খাবারের মানও নিম্নমানের।
ভিডিও কলে শিশুদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করেন ওই বিনোদনকর্মী। তিনি শিশুটিকে আশ্বস্ত করে বলেন, অনেক মানুষ তাদের সাহায্য করতে চায়। কথোপকথনের সময় শিশুটি জানায়, সে তার বন্ধুদের মিস করছে এবং কেন্দ্রের খাবার খেয়ে তার পেটে ব্যথা হয়। তবে তার সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল অন্য জায়গায়। আটক হওয়ার আগে সে স্কুলের বানান প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে আঞ্চলিক পর্যায়ে তৃতীয় হয়েছিল এবং মে মাসে রাজ্য পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিল। সে আবার মুক্ত হয়ে সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চায়।
এই অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বিনোদনকর্মী জানান, একটি শিশুর সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে এমন অনুভূতি হয়েছে যেন তিনি কারাগারে থাকা কারও সঙ্গে কথা বলছেন। বিষয়টি তাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে।
জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের এক শহরে পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুর বাবাকে আটক করে একই কেন্দ্রে পাঠানোর পর বিষয়টি প্রথম তার নজরে আসে। ওই শিশুর একটি ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করে। পরে তাদের মুক্তি দেওয়া হলেও আশ্রয় প্রার্থনার আবেদন বাতিল হয়।
সরকারি নজরদারির তথ্য অনুযায়ী, অভিবাসন অভিযান জোরদার হওয়ার প্রথম বছরে ২৩০০ এর বেশি শিশুকে তাদের বাবা-মায়ের সঙ্গে আটক রাখা হয়েছে, যার বেশিরভাগই এই ডিলি কেন্দ্রে। অনেক শিশু কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সেখানে অবস্থান করেছে।
এই সময়ের মধ্যে ওই বিনোদনকর্মী শিশুদের পক্ষে সোচ্চার কণ্ঠ হিসেবে উঠে এসেছেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা, সুদান ও কঙ্গোতে শিশুদের দুর্দশার বিষয়েও তিনি কাজ করেছেন এবং অর্থ সংগ্রহ করেছেন। যদিও এ নিয়ে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে তাকে।
তিনি বারবার বলেছেন, সব শিশু তার কাছে সমান এবং মূল্যবান।
সম্প্রতি ওই কেন্দ্রে থাকা শিশুদের সঙ্গে কথা বলার পর তিনি আইনজীবী ও অভিবাসন অধিকারকর্মীদের সঙ্গে কাজ শুরু করেছেন, যাতে কেন্দ্রটি বন্ধ করা যায় এবং শিশুদের তাদের স্বাভাবিক পরিবেশে ফিরিয়ে দেওয়া যায়।
অভিভাবক ও আইনজীবীদের অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে শিশুদের খাবারে পোকা পাওয়া গেছে, পর্যাপ্ত চিকিৎসা সেবা নেই এবং দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে ওষুধ নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যগত জটিলতাও দেখা দিয়েছে।
একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়, জানুয়ারিতে যেখানে প্রায় ৫০০ শিশু ছিল, বর্তমানে সেখানে সংখ্যা কমে প্রায় ৫০-এ দাঁড়িয়েছে। কিছু পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে মুক্তি দেওয়া হয়েছে, আবার কিছু পরিবারকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এই সংখ্যাগত পরিবর্তনের পেছনে মানবাধিকারকর্মী, আইনপ্রণেতা ও আইনজীবীদের চাপ কাজ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, সেখানে পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা হয় এবং কেন্দ্রটি তাদের চাহিদা অনুযায়ী নির্মিত।
ভিডিও কলে আরেকটি শিশুর অবস্থাও উদ্বেগজনক ছিল। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ওই শিশুর শারীরিক অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটেছে বলে পরিবার জানিয়েছে। চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা না থাকায় তার সমস্যা আরও বেড়েছে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে বিনোদনকর্মী বলেন, শিশুদের সঙ্গে এমন আচরণ অবহেলা এবং নির্যাতনের শামিল। একই সঙ্গে তিনি জানান, একটি শিশুকে তার স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত করা নির্মমতা।
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, শিশুদের অধিকার নিয়ে কথা বলা রাজনৈতিক বিষয় হলেও তিনি এতে পিছপা নন। তার মতে, প্রতিটি শিশুই ভালোবাসা ও যত্ন পাওয়ার যোগ্য এবং তাদের প্রতি দায়িত্ব সীমান্ত বা পরিচয়ের ভিত্তিতে থেমে থাকা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন, যদি এই অবস্থান গ্রহণ করাই শিশুদের মুক্তি নিশ্চিত করতে সাহায্য করে, তবে তার বিবেক তাকে অন্য কোনো পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ দেয় না।





Add comment