বরফে মোড়ানো হকি রিঙ্ক, তীক্ষ্ণ স্কেটের শব্দ আর উত্তেজনায় ভরা দর্শকসারি—এই জায়গাটিই এক কিশোরের জীবনে এনে দিয়েছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক ও একই সঙ্গে সবচেয়ে আনন্দময় মুহূর্ত। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে জীবনের দুই চরম অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছে সে।
ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে এক ভয়াবহ ঘটনায় ওই কিশোর তার মা, ভাই ও দাদাকে হারায়। যুক্তরাষ্ট্রের একটি অঙ্গরাজ্যের একটি হকি ম্যাচ চলাকালে গুলির ঘটনায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। মাঠের ভেতরে খেলার উত্তেজনা, স্টিক ও স্কেটের শব্দের মাঝেই আচমকা গুলির শব্দে বদলে যায় পুরো দৃশ্যপট।
এই ঘটনার পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা সহজ ছিল না। কিছুটা সময় নিয়ে আবার রিঙ্কে ফেরে দলটির অধিনায়ক। ফিরে এসেই যেন নিজেকে নতুনভাবে প্রমাণ করে সে। ডিভিশনাল চ্যাম্পিয়নশিপ ম্যাচে নাটকীয় লড়াই শেষে ডাবল ওভারটাইমে জয়সূচক গোল করে দলকে স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপে তুলে নেয়।
তবে সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে দর্শকসারিতে খালি পড়ে ছিল তিনটি আসন, যেখানে থাকার কথা ছিল তার সবচেয়ে বড় সমর্থকদের।
দলটির প্রধান কোচ, যিনি পেশায় অবসরপ্রাপ্ত দমকলকর্মী, নিজের দীর্ঘ কর্মজীবনে অনেক দুর্ঘটনা কাছ থেকে দেখেছেন। কিন্তু এই ঘটনার মতো ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আগে কখনো হননি বলে জানান তিনি। ম্যাচ চলাকালে খেলোয়াড়রা যখন নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছিল, তখন তিনি দ্রুত এগিয়ে গিয়ে আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেন।
ঘটনার পর দলকে আবার মাঠে ফেরানো ছিল কঠিন সিদ্ধান্ত। কোচরা কয়েকদিন পর খেলোয়াড়দের নিয়ে বৈঠক করেন এবং সবাইকে সময় নিয়ে ভাবার সুযোগ দেন যে তারা মৌসুম চালিয়ে যেতে চায় কিনা। কোনো ধরনের চাপ ছিল না।
কোচের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহত পরিবারের সদস্যরা কখনোই চাইতেন না এইভাবে মৌসুম শেষ হোক। কয়েকদিন পর খেলোয়াড় ও তাদের পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে দল চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কোচ স্পষ্ট করে জানান, যারা মাঠে বা দর্শকসারিতে থাকতে চায়, সবাইকে নিয়েই তারা এগিয়ে যাবেন।
এ সময়টাতে দলটি প্রায় প্রতিদিন একসঙ্গে সময় কাটিয়েছে। অনুশীলনের পাশাপাশি তারা বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশ নেয়, একসঙ্গে খাবার খায় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ব্যক্তিগত ও দলগত কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে মানসিকভাবে নিজেদের শক্ত করে তোলা।
কোচ নিজেও ব্যক্তিগতভাবে কঠিন সময় পার করছিলেন। দীর্ঘ ৩২ বছরের কোচিং ক্যারিয়ার শেষ করার ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে এক বছরে চারবার অস্ত্রোপচারও করতে হয়েছে। কিন্তু এই ঘটনার পর তিনি সিদ্ধান্ত বদলান এবং জানান, এই দলকে ছেড়ে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।
অন্যদিকে, শোক সামলে প্রায় দুই সপ্তাহ পর দলে ফেরে কিশোর অধিনায়ক। শুরুতে কঠিন হলেও ধীরে ধীরে সে নিজেকে মানিয়ে নেয়। কোচের মতে, রিঙ্কে ফিরে তার মুখে আবারও আনন্দের ছাপ দেখা যায়।
ডিভিশনাল চ্যাম্পিয়নশিপের আগে খুব অল্প সময় প্রস্তুতির সুযোগ ছিল। খেলোয়াড়রা তাদের জার্সিতে নিহত তিনজনের নামের আদ্যক্ষরসহ হৃদয়ের প্রতীক ধারণ করে মাঠে নামে। এতে দলের মধ্যে এক ধরনের ঐক্য ও আবেগ তৈরি হয়।
একজন ডিফেন্ডার হিসেবে গোল করা তার নিয়মিত কাজ ছিল না। কিন্তু প্লে-অফে সে নিজেকে অন্যভাবে তুলে ধরে। কোয়ার্টার ফাইনালে দুইটি গোল করার পর সেমিফাইনালেও একই আত্মবিশ্বাস বজায় রাখে।
সেমিফাইনালে ম্যাচের শেষদিকে সমতায় ফেরার পর খেলা গড়ায় ওভারটাইমে। দ্বিতীয় ওভারটাইমে প্রতিপক্ষের দুই ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে গোলরক্ষকের সামনে গিয়ে নিখুঁত শটে বল জালে জড়িয়ে দেয় সে। ৩-২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয় এবং দল উঠে যায় স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপে।
গোলের পর স্টেডিয়ামজুড়ে উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। সতীর্থরা তাকে ঘিরে উদযাপনে মেতে ওঠে। কোচ জানান, সেই মুহূর্তে কিশোরের মুখে যে আবেগ তিনি দেখেছেন, তা ছিল অসাধারণ এবং তার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।
চ্যাম্পিয়নশিপের পথে এগিয়ে যাওয়ার সময় দলটির অভিজ্ঞতা ছিল বেদনা, উদ্বেগ এবং একসঙ্গে থাকার শক্তিতে ভরপুর। এই বন্ধনই তাদের সাফল্যের মূল চালিকা শক্তি হয়ে দাঁড়ায়।
পরবর্তী ম্যাচেও দলটি লড়াই চালিয়ে যায়। পিছিয়ে পড়েও শেষ মুহূর্তে সমতায় ফেরে অধিনায়কের গোলে। এরপর টানটান উত্তেজনার ম্যাচে একাধিক ওভারটাইম শেষে জয় নিশ্চিত করে দলটি।
এই যাত্রা শুধু একটি খেলার জয় নয়, বরং শোককে শক্তিতে রূপান্তরের এক অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকে।





Add comment