মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় সোনা দাম স্থির

ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধ আজ বুধবার ১৯তম দিনে পৌঁছেছে। মধ্যপ্রাচ্যে এই সংঘাতের পরিসর ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে, এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষভাবে এই ধরনের অস্থির পরিস্থিতিতে সাধারণত সোনার দাম বৃদ্ধি পায়। কিন্তু এ সময়ও সোনার বাজারে একটি অবাক করা চিত্র দেখা যাচ্ছে—দাম প্রায় স্থির রয়েছে এবং উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়নি।

ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রথম ধাপে ইরানের লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তীব্র হয়েছে। তবে এই যুদ্ধ শুধু দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি, এটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশেও প্রভাব ফেলেছে। এই অবস্থার মধ্যে তেলের দাম ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে। বিশেষ করে ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ডের শীর্ষ উপদেষ্টা ঘোষণা দিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে তেল ও গ্যাস পরিবহন প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই ঘোষণার প্রভাবেই তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়।

বিশ্লেষকরা লক্ষ্য করছেন, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও সোনার বাজারে তেমন উত্থান দেখা যাচ্ছে না। গত বছরের তুলনায় সোনার দাম ইতিমধ্যেই প্রায় ৭০ শতাংশ বেড়েছে। চলতি বছরের শুরুতে, ২৬ জানুয়ারি, সোনার দাম আউন্সপ্রতি পাঁচ হাজার ডলারের সীমানা অতিক্রম করেছিল। এরপর থেকে বাজারে দাম আউন্সপ্রতি প্রায় পাঁচ হাজার ডলারের কাছাকাছি ঘোরাফেরা করছে।

আজকের প্রতিবেদনের সময় নিউইয়র্কের স্পট মার্কেটে সোনার দাম আউন্সপ্রতি ৪ হাজার ৯৯১ ডলারের মতো স্থির ছিল। এতে সামান্য ১০ ডলারের পতন লক্ষ্য করা গেছে। অন্যদিকে এপ্রিলে সরবরাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের গোল্ড ফিউচার্সের দাম ৪ হাজার ৯৯৮ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। স্পট মার্কেট মূলত তাৎক্ষণিক চাহিদা অনুযায়ী সোনার বর্তমান মূল্য নির্ধারণ করে, যেখানে ফিউচার্স মার্কেট আগামী সরবরাহের ভিত্তিতে দামের পূর্বাভাস দেয়।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই স্থিতিশীলতার মূল কারণ হলো বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এবং মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুদের হারের নীতি। মূল্যস্ফীতি বাড়ার সম্ভাবনা এবং সুদের হার বৃদ্ধি বা হ্রাস সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের জন্য সোনার আকর্ষণকে কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে। যখন ডলারের মূল্য বৃদ্ধি পায়, তখন বিনিয়োগকারীরা ডলারের দিকে ঝোঁকেন, কারণ সোনা সুদের সুবিধা দেয় না।

ফরাসি আন্তর্জাতিক ও কৌশলগত গবেষণা ইনস্টিটিউটের অর্থনীতিবিদ জানান, পূর্বের পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ পরিস্থিতিতে যেমন রাশিয়া–ইউক্রেন সংঘাতের সময়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মধ্যে আতঙ্ক সোনার বাজারে দ্রুত বৃদ্ধির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু বর্তমান যুদ্ধের প্রেক্ষিতে সোনার বাজারের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলকভাবে ধীর। এছাড়া, বছরের শুরু থেকেই সোনার দাম ইতিমধ্যেই উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে, যা নতুন উত্থানকে সীমিত করছে।

ব্রুগেল থিঙ্কট্যাংকের বিশ্লেষকও উল্লেখ করেছেন, সোনার বর্তমান দাম ঐতিহাসিক গড়ের তুলনায় যথেষ্ট বেশি এবং ডলার শক্তিশালী হওয়ার কারণে এটি আরও বাড়ানো কঠিন হয়ে গেছে। ডলার ও সোনার বাজারের সম্পর্ক মূলত বিপরীতমুখী—ডলার শক্তিশালী হলে সোনার দাম বাড়ানো কঠিন হয়। এছাড়া তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতিও ডলারের দিকে বিনিয়োগকে উৎসাহিত করছে।

সর্বশেষ, বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, সোনার দাম আপাতত স্থির থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এবং ক্ষয়ক্ষতি বৃদ্ধি পেলে বিনিয়োগকারীরা আবার সোনার দিকে ঝুঁকতে পারেন। তবে বর্তমানে সোনা বিনিয়োগকারীদের কাছে সেই পর্যায়ের নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে না।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed