জ্বালানি সংকটে এশিয়াজুড়ে কৃচ্ছ্রসাধন পদক্ষেপ

মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত ঘিরে সম্ভাব্য জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় এশিয়ার বিভিন্ন দেশ সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে শ্রীলঙ্কা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সপ্তাহে অতিরিক্ত একদিন ছুটি ঘোষণা করেছে, ফলে দেশটিতে এখন সাপ্তাহিক ছুটি দাঁড়িয়েছে তিন দিনে। প্রতি বুধবার এই ছুটি কার্যকর থাকবে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটির সরকার জরুরি বৈঠক করেছে। বৈঠকে রাষ্ট্রপ্রধান বলেন, সম্ভাব্য কঠিন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকা জরুরি, পাশাপাশি ইতিবাচক ফলের প্রত্যাশাও রাখতে হবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্যমতে, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভারত ও রাশিয়ার সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে শ্রীলঙ্কা সরকার।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার জেরে ইরান পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানালে সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে তেল ও গ্যাস পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। কারণ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত জ্বালানির প্রায় ৯০ শতাংশের গন্তব্য এশিয়া। বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি আমদানিকারক অঞ্চল হওয়ায় এ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে।

এই প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশ জ্বালানি সাশ্রয়ে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। থাইল্যান্ড সরকার নাগরিকদের শীতাতাপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছে এবং আনুষ্ঠানিক পোশাকের পরিবর্তে হালকা পোশাক পরতে উৎসাহিত করছে। মিয়ানমারে ব্যক্তিগত যানবাহন চলাচলে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে, যেখানে লাইসেন্স নম্বর অনুযায়ী একদিন পরপর গাড়ি চালানোর অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশেও কিছু সময়ের জন্য জ্বালানি সাশ্রয়ে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। তবে ঈদ উপলক্ষে মানুষের দুর্ভোগ কমাতে তা সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ফিলিপাইনে সরকারি দপ্তরগুলোতে সপ্তাহে অন্তত একদিন বাড়ি থেকে কাজ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রপ্রধান সরকারি কর্মচারীদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে তেলের বাড়তি দামের প্রভাব কমাতে ট্রাইসাইকেল চালক, কৃষক ও জেলেদের জন্য নগদ সহায়তা ঘোষণা করা হয়েছে, যার পরিমাণ তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার পেসোর মধ্যে।

ভিয়েতনাম সরকারও নাগরিকদের জ্বালানি সাশ্রয়ে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বাড়িতে বেশি সময় কাটানো, সাইকেল ব্যবহার, কারপুলিং এবং গণপরিবহন ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

শ্রীলঙ্কায় গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে বুধবার সাপ্তাহিক ছুটি ঘোষণার ফলে চার দিনের কর্মসপ্তাহ চালু হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। তবে স্বাস্থ্যসেবা ও অভিবাসনসহ জরুরি সেবা খাতকে এর বাইরে রাখা হয়েছে। টানা তিন দিন ছুটি এড়াতে শুক্রবারের পরিবর্তে বুধবারকে ছুটির দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।

এ ছাড়া দেশটিতে জ্বালানি কেনার ক্ষেত্রে জাতীয় জ্বালানি পাস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। তবে বরাদ্দের পরিমাণ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য ১৫ লিটার এবং মোটরসাইকেলের জন্য ৫ লিটার বরাদ্দ অনেকের কাছে অপর্যাপ্ত বলে মনে হচ্ছে।

উল্লেখ্য, ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময় শ্রীলঙ্কায় প্রথম এই ধরনের রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতির কারণে সে সময় প্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানি আমদানি ব্যাহত হয়, যা পরবর্তীতে বড় ধরনের জনঅসন্তোষে রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত তৎকালীন সরকারের পতন ঘটে।

এদিকে ইরান দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালি তাদের প্রতিপক্ষ দেশগুলোর জন্য সীমিত করা হয়েছে। তবে বাস্তবে অন্যান্য দেশের জাহাজও সেখানে আটকে পড়েছে। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই পথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠায় বহু তেলবাহী ট্যাংকার ও বাণিজ্যিক জাহাজ উপসাগরীয় জলসীমায় অপেক্ষা করছে।

এই সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়েছে। তেল সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যুদ্ধ শুরুর আগ থেকেই তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী ছিল এবং চলতি বছরে ইতোমধ্যে তা ৬০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।

BP NEWS USA

Add comment

Follow us

Don't be shy, get in touch. We love meeting interesting people and making new friends.

Most discussed