যুক্তরাষ্ট্রে নির্যাতিত ও অবহেলিত অভিবাসী তরুণদের সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি বিশেষ ব্যবস্থার আওতায় থাকা অনেকেই এখন গ্রেপ্তার ও বহিষ্কারের মুখে পড়ছেন। গত বছর ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট সংস্থা মোট ২৬৫ জন তরুণকে আটক এবং ১৩২ জনকে নিজ দেশে ফেরত পাঠিয়েছে বলে দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগের এক চিঠিতে জানানো হয়েছে, যা এক সিনেটরের কাছে পাঠানো হয়েছিল।
এসব তরুণদের জন্য বিশেষ অভিবাসী কিশোর মর্যাদা বা এসআইজেএস নামে একটি পথ নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা তাদের স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করে। এই কর্মসূচি মূলত তাদের জন্য, যারা নিজ দেশে নির্যাতন, অবহেলা বা পরিত্যাগের শিকার হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সেই সুরক্ষা পাওয়ার পরও তাদের আটক ও বহিষ্কার করা হচ্ছে।
অভিবাসন অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি জোটের পরিচালক বলেন, এসব তরুণদের এমন এক অবস্থায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে, যেখানে তারা নতুন করে গড়ে তোলা স্থিতিশীল জীবন হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে। তারা স্থায়ী সুরক্ষার পথে এগোচ্ছিল, কিন্তু সেই পথ হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
১৯৯০ সালে কংগ্রেস এই কর্মসূচি চালু করে, যাতে নির্যাতিত অভিবাসী শিশু-কিশোররা যুক্তরাষ্ট্রে থেকে আইনি স্বীকৃতি পেতে পারে। তবে গ্রিন কার্ডের দীর্ঘসূত্রতার কারণে ২০২২ সাল থেকে অনেকেই ‘ডিফার্ড অ্যাকশন’ নামের একটি নীতির আওতায় সাময়িক সুরক্ষা পেতেন। এর ফলে তারা বহিষ্কার থেকে রক্ষা পেতেন এবং বৈধভাবে কাজ করার সুযোগ পেতেন।
কিন্তু গত বছরের মাঝামাঝি এই নীতি বাতিল করা হয়, যদিও বিষয়টি এখনো আদালতে বিচারাধীন থাকায় কার্যকর স্থগিত রয়েছে। কর্তৃপক্ষের যুক্তি ছিল, এই সুরক্ষা দেওয়ার জন্য কংগ্রেস স্পষ্ট অনুমতি দেয়নি এবং ভিসার ঘাটতি বা পারিবারিক পরিস্থিতি যথেষ্ট কারণ নয়।
এক সিনেটর বলেন, এসব তরুণদের চিহ্নিত করা হয়েছে কারণ তারা ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে এসেছে। তাদের যেন নতুন করে ক্ষতি বা শোষণের শিকার হতে না হয়, সে জন্যই আইনগত সুরক্ষা তৈরি করা হয়েছিল।
শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি সংস্থার নীতিবিশ্লেষক জানান, প্রকাশিত সংখ্যাগুলো তাদের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি, যা উদ্বেগজনক।
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ জানায়, যাদের বহিষ্কার করা হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে মূলত অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল, যেমন বৈধ কাগজপত্র ছাড়া দেশে অবস্থান করা। তবে তাদের মধ্যে কেউ ফৌজদারি অপরাধে জড়িত ছিল কি না, সে তথ্য স্পষ্ট করা হয়নি।
একটি মামলায় দেখা গেছে, ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরকে বিশেষ মর্যাদা পাওয়ার পরও নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আদালতের নথি অনুযায়ী, সে তার মায়ের কাছ থেকে গুরুতর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে এসে সে পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে বসবাস শুরু করে। কিন্তু কোনো পূর্ব নোটিশ ছাড়াই তার ডিফার্ড অ্যাকশন বাতিল করা হয় এবং পরে তাকে বহিষ্কার করা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আইনজীবীরা দাবি করেছেন, তাকে আইনগত প্রক্রিয়া ছাড়াই আটক রাখা এবং পরে বহিষ্কার করা হয়েছে, যা তার সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের শামিল। বর্তমানে এই মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
অন্যদিকে, আরও অনেক তরুণ এখনো আটক অবস্থায় রয়েছেন। গত জুনে একদল আইনপ্রণেতা জানতে চান, কতজন এসআইজেএসধারী তরুণ আটক বা বহিষ্কৃত হয়েছেন কিংবা তাদের সুরক্ষা বাতিল হয়েছে।
পরে বিভিন্ন সংগঠন আদালতে মামলা করে এই নীতি বাতিলের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ জানায়। এক পর্যায়ে একজন বিচারক সরকারকে এই সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখতে নির্দেশ দেন।
আইনজীবীরা অভিযোগ করছেন, কোনো অপরাধের ইতিহাস না থাকা সত্ত্বেও অনেক তরুণকে আটক করা হচ্ছে এবং কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তাদের সুরক্ষা বাতিল করা হচ্ছে।
সরকারি তথ্যে দেখা গেছে, গত বছর প্রায় ৯৯০ জনের ডিফার্ড অ্যাকশন বাতিল করা হয়েছে। তবে এর মধ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রে নেতিবাচক তথ্য থাকার কথা বলা হলেও বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে দেড় লাখের বেশি তরুণ গ্রিন কার্ডের অপেক্ষায় রয়েছেন। কিন্তু যারা আবেদন করার আগেই বহিষ্কৃত হচ্ছেন, তারা স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সুযোগ হারাচ্ছেন।
সম্প্রতি আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, এসআইজেএস মর্যাদা ও সুরক্ষা থাকা সত্ত্বেও এক তরুণকে আটক করা হয়েছে। আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, সে বুঝতেই পারছে না কেন তাকে আটক করা হয়েছে, যখন তার সব কাগজপত্র ঠিক রয়েছে।
এদিকে, একটি আপিল বোর্ডের সিদ্ধান্তে এই সুরক্ষার ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আইনজীবীরা মনে করছেন, এর ফলে আরও বেশি তরুণ বহিষ্কারের আদেশ পেতে পারেন, অনেকেই গ্রিন কার্ডের আবেদন করার আগেই।
একটি পৃথক ঘটনায়, একজন বিচারক রায় দেন যে এক তরুণকে ভুলবশত আটক করা হয়েছিল এবং তার সুরক্ষা বাতিল করা সম্পূর্ণ বেআইনি। ওই তরুণ জানান, এই ঘটনার পর থেকে তিনি সবসময় আতঙ্কে থাকেন এবং বাইরে বের হতেও ভয় পান।
বিচারক মন্তব্য করেন, এমন আচরণ মানবিক মূল্যবোধের পরিপন্থী এবং এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।





Add comment