যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসন কর্তৃপক্ষের হেফাজতে নেওয়ার মাত্র একদিনেরও কম সময়ের মধ্যে এক আফগান আশ্রয়প্রার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বেগ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। পরিবার, অভিবাসী অধিকারকর্মী এবং স্থানীয় আফগান সম্প্রদায়ের সদস্যরা এ ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
৪১ বছর বয়সী ওই আফগান নাগরিক ছিলেন ছয় সন্তানের জনক এবং আফগানিস্তানে অবস্থানকালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে কাজ করেছিলেন বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার। পরিবারের দাবি, টেক্সাসে আটক হওয়ার আগে তাঁর কোনো ধরনের শারীরিক অসুস্থতার ইতিহাস ছিল না।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার সকালে ডালাস শহরতলি রিচার্ডসনে নিজ অ্যাপার্টমেন্টের সামনে সন্তানদের স্কুলে পৌঁছে দিতে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। ঠিক সেই সময় মুখোশধারী কয়েকজন ব্যক্তি গাড়ি নিয়ে এসে তাঁকে ঘিরে ফেলে এবং হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যায়। স্থানীয় আফগান সম্প্রদায়ের এক নেতা, যিনি পরিবারটির ঘনিষ্ঠ বন্ধু, গণমাধ্যমকে জানান যে ঘটনার সময় তাঁর সন্তানরা কান্নায় ভেঙে পড়ে এবং চিৎকার করতে থাকে। স্ত্রী বারান্দায় এসে কর্মকর্তাদের কাছে অনুরোধ করলেও তাঁকে নিয়ে যাওয়া থেকে বিরত রাখা যায়নি।
পরে সেদিন আটক অবস্থায় আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগের সময় ওই ব্যক্তি জানান যে তিনি ভালো অনুভব করছেন না। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শুক্রবার রাতের দিকে তাঁদের জানানো হয় যে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এরপর শনিবার সকালে আবার জানানো হয় যে তিনি মারা গেছেন।
অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, আফগানিস্তান থেকে আসা ওই ব্যক্তিকে একটি লক্ষ্যভিত্তিক অভিযানে আটক করা হয়েছিল। সংস্থাটি তাকে “অপরাধী অবৈধ অভিবাসী” হিসেবে উল্লেখ করে এবং জানিয়েছে যে মৃত্যুর কারণ তদন্তাধীন রয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, শুক্রবার রাতে ডালাসের একটি আইসিই কার্যালয়ে অবস্থানকালে তিনি শ্বাসকষ্ট ও বুকে ব্যথার অভিযোগ করেন। এরপর তাকে দ্রুত পার্কল্যান্ড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে শ্বাসপ্রশ্বাসের চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং চিকিৎসকেরা পর্যবেক্ষণের জন্য হাসপাতালে এক রাত থাকার পরামর্শ দেন।
আইসিইর তথ্যমতে, শনিবার সকালে হাসপাতালে নাশতা করার সময় চিকিৎসাকর্মীরা লক্ষ্য করেন যে তাঁর জিহ্বা ফুলে গেছে, যার পরপরই জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। একাধিক জীবনরক্ষাকারী চেষ্টা চালানোর পর সকাল ৯টা ১০ মিনিটে তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
সংস্থাটি আরও দাবি করেছে, গত শরৎকাল থেকে তাকে দুবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। একবার খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে জালিয়াতির অভিযোগে এবং আরেকবার চুরির অভিযোগে। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে এসব তথ্যের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে বলে স্থানীয় আফগান সম্প্রদায়ের ওই নেতা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, আফগান মিত্রদের সহায়তায় কাজ করা একটি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংগঠন বলেছে, একজন সুস্থ ৪১ বছর বয়সী মানুষের এভাবে হঠাৎ মৃত্যুকে স্বাভাবিক বলা যায় না। সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট এক বিবৃতিতে বলেন, আফগানিস্তানের যুদ্ধে বেঁচে গিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ভরসা করে এখানে নতুন জীবন শুরু করেছিলেন। তাই তাঁর পরিবার, যুক্তরাষ্ট্রের জনগণ এবং যেসব মার্কিন সেনা আফগান অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করেছেন, সবাই এই ঘটনার স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়ার অধিকার রাখেন।
আইসিইর বিবৃতিতে তাঁর সামরিক পটভূমির উল্লেখ করা হয়নি। পরিবারের দাবি, তিনি ২০০৫ সাল থেকে পাকতিকা প্রদেশে আফগান বিশেষ বাহিনীর সদস্য হিসেবে কাজ করার সময় যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি স্পেশাল ফোর্সের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিলেন।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে সেই কাজ ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবু তিনি বিশ্বাস করতেন যে এর মাধ্যমে নিজের দেশে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে।
২০২১ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন বাহিনী আফগানিস্তান থেকে প্রত্যাহার করার সময় এবং তালেবানের পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার প্রেক্ষাপটে মার্কিন সরকার ওই ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারকে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়।
সংগঠনটির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে এসে তিনি ডালাস এলাকায় একটি আফগান হালাল মার্কেটে কাজ করতেন এবং স্ত্রী ও সন্তানদের প্রধান উপার্জনকারী ছিলেন। তাঁর সর্বকনিষ্ঠ সন্তানের বয়স মাত্র ১৮ মাস।
শনিবার ডালাসের হাসপাতালে শতাধিক আফগান সম্প্রদায়ের সদস্য জড়ো হয়ে তাঁর মরদেহ দেখতে চান বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ওই নেতা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত মরদেহ হস্তান্তর করা সম্ভব নয়।
সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে এখন ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলেও তিনি জানান। তাঁর ভাষায়, তারা এই দেশে সহায়তা করেছে এবং পাশে থেকেছে। কিন্তু এমন ঘটনা ঘটলে তাদের পরিবার নিজেদের নিরাপদ মনে করতে পারে না।
তিনি বলেন, সম্প্রদায়ের মানুষ এখন ন্যায়বিচার চায় এবং তাদের মূল দাবি একটাই, এই ধরনের গ্রেপ্তার অভিযান বন্ধ করা।





Add comment